১০:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ ও আতঙ্কিত করার অভিযোগ উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতাকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিহত করার হুমকি দিয়েছেন আতার ভাতিজি জামাই জাহাঙ্গীর হোসেন। একই সঙ্গে মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনায় আফরোজা খানম রিতাকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন ও আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

গত ১২ জানুয়ারি রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আপিল শুনানি শেষে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহাঙ্গীর হোসেন এসব বক্তব্য দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতা নিজেও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

ভিডিওতে জাহাঙ্গীর হোসেনকে বলতে শোনা যায়, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের ‘বহিরাগত’ আফরোজা খানম রিতা তাঁর ‘একক আধিপত্য’ ব্যবহার করে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বাতিল করিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি আরও উসকানিমূলক ভাষায় বলেন,
“কোনো বহিরাগত, কোনো রোহিঙ্গার জায়গা মানিকগঞ্জে হবে না।”

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, আতাউর রহমান আতার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছিলেন মানিকগঞ্জ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা। এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনগত সিদ্ধান্ত।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী—
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও গ্রহণ বা বাতিলের একক এখতিয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার। কোনো প্রার্থী, দল বা ব্যক্তির পক্ষে অন্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করানোর আইনগত সুযোগ নেই।

পরবর্তীতে আতাউর রহমান আতা নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে কমিশন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে। ফলে এ ঘটনায় আফরোজা খানম রিতাকে দায়ী করার অভিযোগ আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা ও তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য সরাসরি হুমকির শামিল, যা ভোটারদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে একজন নারী প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা চরম অসদাচরণ, মানহানিকর এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্য।

তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচনী মাঠে সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী—

ধারা ৭৩ ও ৭৪: ভয়ভীতি, হুমকি বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কোনো প্রার্থী বা ভোটারকে বাধাগ্রস্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

ধারা ৯০বি: নির্বাচনী অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

নির্বাচনী আচরণবিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী—
কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত, বিদ্বেষমূলক, মানহানিকর বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন না। মিথ্যা তথ্য প্রচার গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাউকে অপমান বা গালি হিসেবে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সেই জনগোষ্ঠীর নামকে অবমাননাকর ভাষা হিসেবে ব্যবহার মানবাধিকার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী—ধারা ৫০০: মানহানিকর ও অপমানজনক বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ধারা ৫০৫(১): এমন বক্তব্য বা প্রচার যা জনমনে ভয়, আতঙ্ক বা শত্রুতা সৃষ্টি করে—তা অপরাধ হিসেবে গণ্য।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞদের মতে,
“নির্বাচনের সময় কোনো প্রার্থীর নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। এতে ভোটার বিভ্রান্তি ও সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।”

তাঁরা আরও বলেন, বক্তব্যদাতা সরাসরি প্রার্থী না হলেও তিনি যদি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং নির্বাচনী প্রচারে যুক্ত থাকেন, তবে আচরণবিধির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে একজন প্রার্থীকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে হুমকি দেওয়া এবং মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় তাঁকে জড়িয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার—দুটিই নির্বাচন আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নির্বাচন মানে মত ও কর্মসূচির প্রতিযোগিতা—অপপ্রচার, বিদ্বেষ ও ভয়ভীতির রাজনীতি নয়। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

মানিকগঞ্জে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধে সমাবেশ অনুষ্ঠিত ।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা

Update Time : ০৮:১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ ও আতঙ্কিত করার অভিযোগ উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতাকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিহত করার হুমকি দিয়েছেন আতার ভাতিজি জামাই জাহাঙ্গীর হোসেন। একই সঙ্গে মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনায় আফরোজা খানম রিতাকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন ও আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

গত ১২ জানুয়ারি রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আপিল শুনানি শেষে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহাঙ্গীর হোসেন এসব বক্তব্য দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতা নিজেও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

ভিডিওতে জাহাঙ্গীর হোসেনকে বলতে শোনা যায়, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের ‘বহিরাগত’ আফরোজা খানম রিতা তাঁর ‘একক আধিপত্য’ ব্যবহার করে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বাতিল করিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি আরও উসকানিমূলক ভাষায় বলেন,
“কোনো বহিরাগত, কোনো রোহিঙ্গার জায়গা মানিকগঞ্জে হবে না।”

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, আতাউর রহমান আতার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছিলেন মানিকগঞ্জ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা। এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনগত সিদ্ধান্ত।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী—
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও গ্রহণ বা বাতিলের একক এখতিয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার। কোনো প্রার্থী, দল বা ব্যক্তির পক্ষে অন্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করানোর আইনগত সুযোগ নেই।

পরবর্তীতে আতাউর রহমান আতা নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে কমিশন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে। ফলে এ ঘটনায় আফরোজা খানম রিতাকে দায়ী করার অভিযোগ আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা ও তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য সরাসরি হুমকির শামিল, যা ভোটারদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে একজন নারী প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা চরম অসদাচরণ, মানহানিকর এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্য।

তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচনী মাঠে সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী—

ধারা ৭৩ ও ৭৪: ভয়ভীতি, হুমকি বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কোনো প্রার্থী বা ভোটারকে বাধাগ্রস্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

ধারা ৯০বি: নির্বাচনী অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

নির্বাচনী আচরণবিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী—
কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত, বিদ্বেষমূলক, মানহানিকর বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন না। মিথ্যা তথ্য প্রচার গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাউকে অপমান বা গালি হিসেবে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সেই জনগোষ্ঠীর নামকে অবমাননাকর ভাষা হিসেবে ব্যবহার মানবাধিকার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী—ধারা ৫০০: মানহানিকর ও অপমানজনক বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ধারা ৫০৫(১): এমন বক্তব্য বা প্রচার যা জনমনে ভয়, আতঙ্ক বা শত্রুতা সৃষ্টি করে—তা অপরাধ হিসেবে গণ্য।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞদের মতে,
“নির্বাচনের সময় কোনো প্রার্থীর নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। এতে ভোটার বিভ্রান্তি ও সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।”

তাঁরা আরও বলেন, বক্তব্যদাতা সরাসরি প্রার্থী না হলেও তিনি যদি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং নির্বাচনী প্রচারে যুক্ত থাকেন, তবে আচরণবিধির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে একজন প্রার্থীকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে হুমকি দেওয়া এবং মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় তাঁকে জড়িয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার—দুটিই নির্বাচন আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নির্বাচন মানে মত ও কর্মসূচির প্রতিযোগিতা—অপপ্রচার, বিদ্বেষ ও ভয়ভীতির রাজনীতি নয়। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।