১০:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

আশুলিয়া ভূমি অফিসে উমেদা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ

ঢাকার আশুলিয়া ভূমি অফিসকে ঘিরে আবারও উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, অফিসের কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারী এবং দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে খাস খতিয়ানভুক্ত, জবরদখলকৃত এমনকি মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত জমিতেও নামজারি করে দিচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। টাকা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই নামজারির কাজ সম্পন্ন হয়, আর টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে আবেদন ঝুলিয়ে রাখা বা বাতিল করে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির দিন আবেদনকারী উপস্থিত থাকলেও কাগজপত্রে তাকে ‘অনুপস্থিত’ দেখিয়ে আবেদন বাতিলের ঘটনাও ঘটছে।

অভিযোগে ভূমি অফিসের নাজির সোহান হাওলাদার, কানুনগো জহিরুল ইসলাম, নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া, উমেদার সাইদুল, ইয়াসিন, আলমগীর শিকদার ঝন্টু, আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ এবং দালাল দ্বীন ইসলামের নাম উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাইপাইল মৌজার ৭২৬২ নম্বর খতিয়ান ও ১৫১৬৫ নম্বর দাগের পাঁচ শতক জমি নিয়ে জবরদখলের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নামজারি করে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই নামজারি বাতিল করা হয়।

ভুক্তভোগী বাবুলের দাবি, জমির পর্চায় ‘জবর দখল’ উল্লেখ থাকায় প্রথমে নামজারি দেওয়া হচ্ছিল না। পরে উমেদার সাইদুলের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার পর নামজারি সম্পন্ন হয়। তবে কিছুদিন পর মোবাইল বার্তার মাধ্যমে তাকে জানানো হয়, তার নামজারি বাতিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উমেদার সাইদুল টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, ওই টাকার অংশ অফিসের একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এর আগেও তার বিরুদ্ধে ভুয়া খারিজ করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, নাজির সোহান হাওলাদার সরকারি দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে জমির খারিজ সংক্রান্ত কাজেই বেশি সময় দেন। স্থানীয়দের মতে, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।

নৈশপ্রহরী মানিক মিয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপস্থিত থাকলেও তিনি অফিস কক্ষে বসে সরকারি কম্পিউটার ব্যবহার করে নামজারির কাজ করছেন, যা সরকারি বিধিমালার পরিপন্থী।

লাভলী নামে এক নারী অভিযোগ করেন, নামজারি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মানিক মিয়া তার কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও কাজ না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে মাত্র এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। বাকি টাকা ‘বড় স্যারকে দেওয়া হয়েছে’ বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মিসকেস তামিল করা, নামজারি শেষে জোত খোলা এবং অন্যান্য কাজে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে বড় রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় প্রায় ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দেওয়ার ঘটনায়। আসলাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি ওই জমির নামজারির আবেদন করেছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রথমে খাস খতিয়ানের জমি হওয়ায় আবেদনটি বাতিল করা হলেও পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা অনুমোদন দেওয়া হয়।

অন্যদিকে বড় আশুলিয়া মৌজার ১৮৫ নম্বর খতিয়ানভুক্ত একটি জমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করলেও সেই জমির মালিকের নাম পরিবর্তন করে ‘চাঁদ চন্দ্র বালা’ নামে নামজারি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে আশুলিয়া ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল চক্র নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আশুলিয়া থানাকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার অভিযোগ ও তদন্তের পরও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই অনিয়ম। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভূমি সেবায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

মানিকগঞ্জে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধে সমাবেশ অনুষ্ঠিত ।

আশুলিয়া ভূমি অফিসে উমেদা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ

Update Time : ০৫:০৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

ঢাকার আশুলিয়া ভূমি অফিসকে ঘিরে আবারও উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, অফিসের কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারী এবং দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে খাস খতিয়ানভুক্ত, জবরদখলকৃত এমনকি মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত জমিতেও নামজারি করে দিচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। টাকা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই নামজারির কাজ সম্পন্ন হয়, আর টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে আবেদন ঝুলিয়ে রাখা বা বাতিল করে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির দিন আবেদনকারী উপস্থিত থাকলেও কাগজপত্রে তাকে ‘অনুপস্থিত’ দেখিয়ে আবেদন বাতিলের ঘটনাও ঘটছে।

অভিযোগে ভূমি অফিসের নাজির সোহান হাওলাদার, কানুনগো জহিরুল ইসলাম, নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া, উমেদার সাইদুল, ইয়াসিন, আলমগীর শিকদার ঝন্টু, আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ এবং দালাল দ্বীন ইসলামের নাম উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাইপাইল মৌজার ৭২৬২ নম্বর খতিয়ান ও ১৫১৬৫ নম্বর দাগের পাঁচ শতক জমি নিয়ে জবরদখলের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নামজারি করে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই নামজারি বাতিল করা হয়।

ভুক্তভোগী বাবুলের দাবি, জমির পর্চায় ‘জবর দখল’ উল্লেখ থাকায় প্রথমে নামজারি দেওয়া হচ্ছিল না। পরে উমেদার সাইদুলের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার পর নামজারি সম্পন্ন হয়। তবে কিছুদিন পর মোবাইল বার্তার মাধ্যমে তাকে জানানো হয়, তার নামজারি বাতিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উমেদার সাইদুল টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, ওই টাকার অংশ অফিসের একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এর আগেও তার বিরুদ্ধে ভুয়া খারিজ করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, নাজির সোহান হাওলাদার সরকারি দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে জমির খারিজ সংক্রান্ত কাজেই বেশি সময় দেন। স্থানীয়দের মতে, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।

নৈশপ্রহরী মানিক মিয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপস্থিত থাকলেও তিনি অফিস কক্ষে বসে সরকারি কম্পিউটার ব্যবহার করে নামজারির কাজ করছেন, যা সরকারি বিধিমালার পরিপন্থী।

লাভলী নামে এক নারী অভিযোগ করেন, নামজারি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মানিক মিয়া তার কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও কাজ না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে মাত্র এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। বাকি টাকা ‘বড় স্যারকে দেওয়া হয়েছে’ বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মিসকেস তামিল করা, নামজারি শেষে জোত খোলা এবং অন্যান্য কাজে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে বড় রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় প্রায় ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দেওয়ার ঘটনায়। আসলাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি ওই জমির নামজারির আবেদন করেছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রথমে খাস খতিয়ানের জমি হওয়ায় আবেদনটি বাতিল করা হলেও পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা অনুমোদন দেওয়া হয়।

অন্যদিকে বড় আশুলিয়া মৌজার ১৮৫ নম্বর খতিয়ানভুক্ত একটি জমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করলেও সেই জমির মালিকের নাম পরিবর্তন করে ‘চাঁদ চন্দ্র বালা’ নামে নামজারি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে আশুলিয়া ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল চক্র নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আশুলিয়া থানাকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার অভিযোগ ও তদন্তের পরও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই অনিয়ম। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভূমি সেবায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।