০৬:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

সাটুরিয়ার বকুল তলায় মানবিকতার চিকিৎসা

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাটারা বাজারের পূর্ব পাশে বকুল তলার নিচের জমিতে বুধবার (৭ জানুয়ারি ২০২৬) ভোর থেকেই ছিল মানুষের ঢল। কারও হাতে পুরনো প্রেসক্রিপশন, কারও কোলে অসুস্থ শিশু, আবার কেউ দীর্ঘদিনের ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে। শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য যাদের নেই, সেই প্রান্তিক মানুষের কাছে এ বকুল তলাই সেদিন হয়ে ওঠে ভরসার এক ঠিকানা।

প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা এই চিকিৎসাসেবায় অংশ নেন কয়েক হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু।

পাশের গজর্না গ্রাম থেকে আসা ৮৫ বছরের বেশি বয়সী মো. ইব্রাহিম দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছিলেন। খরচের ভয়ে শহরের হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার। ক্যাম্পে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেয়ে চোখে স্বস্তির ঝিলিক নিয়ে তিনি বলেন,
“এখানে এসে ডাক্তার দেখালাম, ওষুধও ফ্রি পেলাম। আল্লাহ যেন এদের ভালো রাখে।”

এই মেডিকেল ক্যাম্পে শুধু চিকিৎসা পরামর্শই নয়, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, ইসিজি, ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস্, অর্থোপেডিক্স, কার্ডিওলজি, নাক-কান-গলা, ডেন্টাল, চর্ম ও যৌন, চক্ষু এবং শিশু ও নবজাতক—মোট ১০টি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এক ছাতার নিচে সেবা দেন।

মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন বলেন,
“অসহায় মানুষের মুখে স্বস্তির হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”

মুন্নু মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল করিম জানান, এই আয়োজন কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়।
তিনি বলেন, “মানিকগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”

ক্যাম্পে আগত রোগীদের মধ্যে যাদের অপারেশন প্রয়োজন, তাদের জন্য মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশন চার্জে ৩০ শতাংশ, প্যাথলজি পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ এবং সাধারণ বেড চার্জে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দেয় কর্তৃপক্ষ।

দিনের শেষে বকুল তলার পরিবেশ যেন বদলে যায়। হতাশ চোখে আসা মানুষগুলো ফেরেন নতুন আশার আলো নিয়ে। কারও হাতে ওষুধের প্যাকেট, কারও মনে ভবিষ্যতের ভরসা। সাটুরিয়ার এই বকুল তলায় সেদিন চিকিৎসা শুধু একটি সেবা ছিল না—ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল গল্প।

উল্লেখ্য, এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আফরোজা খানম রিতার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তাঁর নির্দেশনায় মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিতভাবে দুস্থ ও অসচ্ছল রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ছাড় প্রদান করা হচ্ছে। ফলে একদিনের মেডিকেল ক্যাম্পের বাইরেও বছরজুড়ে আর্থিক সংকটে থাকা রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন—যা প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি ভরসা হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

মানিকগঞ্জে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধে সমাবেশ অনুষ্ঠিত ।

সাটুরিয়ার বকুল তলায় মানবিকতার চিকিৎসা

Update Time : ০৮:১৩:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাটারা বাজারের পূর্ব পাশে বকুল তলার নিচের জমিতে বুধবার (৭ জানুয়ারি ২০২৬) ভোর থেকেই ছিল মানুষের ঢল। কারও হাতে পুরনো প্রেসক্রিপশন, কারও কোলে অসুস্থ শিশু, আবার কেউ দীর্ঘদিনের ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে। শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য যাদের নেই, সেই প্রান্তিক মানুষের কাছে এ বকুল তলাই সেদিন হয়ে ওঠে ভরসার এক ঠিকানা।

প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা এই চিকিৎসাসেবায় অংশ নেন কয়েক হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু।

পাশের গজর্না গ্রাম থেকে আসা ৮৫ বছরের বেশি বয়সী মো. ইব্রাহিম দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছিলেন। খরচের ভয়ে শহরের হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার। ক্যাম্পে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেয়ে চোখে স্বস্তির ঝিলিক নিয়ে তিনি বলেন,
“এখানে এসে ডাক্তার দেখালাম, ওষুধও ফ্রি পেলাম। আল্লাহ যেন এদের ভালো রাখে।”

এই মেডিকেল ক্যাম্পে শুধু চিকিৎসা পরামর্শই নয়, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, ইসিজি, ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস্, অর্থোপেডিক্স, কার্ডিওলজি, নাক-কান-গলা, ডেন্টাল, চর্ম ও যৌন, চক্ষু এবং শিশু ও নবজাতক—মোট ১০টি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এক ছাতার নিচে সেবা দেন।

মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন বলেন,
“অসহায় মানুষের মুখে স্বস্তির হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”

মুন্নু মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল করিম জানান, এই আয়োজন কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়।
তিনি বলেন, “মানিকগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”

ক্যাম্পে আগত রোগীদের মধ্যে যাদের অপারেশন প্রয়োজন, তাদের জন্য মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশন চার্জে ৩০ শতাংশ, প্যাথলজি পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ এবং সাধারণ বেড চার্জে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দেয় কর্তৃপক্ষ।

দিনের শেষে বকুল তলার পরিবেশ যেন বদলে যায়। হতাশ চোখে আসা মানুষগুলো ফেরেন নতুন আশার আলো নিয়ে। কারও হাতে ওষুধের প্যাকেট, কারও মনে ভবিষ্যতের ভরসা। সাটুরিয়ার এই বকুল তলায় সেদিন চিকিৎসা শুধু একটি সেবা ছিল না—ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল গল্প।

উল্লেখ্য, এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আফরোজা খানম রিতার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তাঁর নির্দেশনায় মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিতভাবে দুস্থ ও অসচ্ছল রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ছাড় প্রদান করা হচ্ছে। ফলে একদিনের মেডিকেল ক্যাম্পের বাইরেও বছরজুড়ে আর্থিক সংকটে থাকা রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন—যা প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি ভরসা হয়ে উঠেছে।