১২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
মোহাম্মদ জাহিদ মীরের প্রদীপ্ত জীবনগাথা ও পারিবারিক পরিচিতি

জননেতা ও শিক্ষক: মোহাম্মদ জাহিদ মীর [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-৭]

“কীর্তিমানের মৃত্যু নেই”—এই কালজয়ী উক্তিটি যাঁর জীবনের প্রতিটি ছত্রে সত্য হয়ে ধরা দেয়, তিনি হলেন মানিকগঞ্জের গর্ব, জননন্দিত শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগণ্য সংগঠক মোহাম্মদ জাহিদ মীর। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘জাহিদ মাস্টার’ নামেই পরম শ্রদ্ধা, অবিনাশী ভক্তি ও ভালোবাসার আসনে অবিচল।

​মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার ১ নম্বর পয়লা ইউনিয়নের ছোট পয়লা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী, সংস্কৃতিমনা ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দরবেশ মীর ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী, দানশীল ও ন্যায়পরায়ণ একজন মানুষ এবং মাতা সাহাতন বেগম ছিলেন এক রত্নগর্ভা জননী। চার ভাইয়ের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল তৃতীয়।

​তাঁর অন্য ভাইয়েরা হলেন সৈয়দ আলী মীর, ইব্রাহিম মীর এবং আমজাদ হোসেন মীর। এই মীর পরিবারটি শুধু এলাকায় নয়, গোটা মানিকগঞ্জ জুড়েই সততা, দেশপ্রেম, শিক্ষানুরাগ এবং আভিজাত্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে সর্বস্বীকৃত ছিল।

Medium Link

https://bit.ly/4qDzkG7

জাহিদ মীর ছিলেন মেধা, প্রজ্ঞা ও মননের এক দুর্লভ ও অনন্য সমন্বয়। তৎকালীন সময়ে যখন উচ্চশিক্ষা ছিল এক পরম সৌভাগ্যের ও দুষ্কর বিষয়, তখন তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইংরেজি—উভয় বিষয়েই অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর (ডাবল এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।

​তাঁর এই অগাধ পাণ্ডিত্য, প্রখর মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমগ্র জেলায় এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানকে আকাশচুম্বী করে তুলেছিল।

​প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। একজন তুখোড়, ক্ষিপ্রগতির ফুটবলপ্রেমী এবং অসামান্য দক্ষ ফুটবলার হিসেবে দেশজুড়ে তাঁর ব্যাপক সুনাম ছিল।

​তাঁের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও অবিসংবাদিত ‘মোহনবাগান’ ক্লাব নিজেদের দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। মোহনবাগানের জার্সি গায়ে তাঁর সেই ফুটবলশৈলী তৎকালীন ক্রীড়ামোদী মানুষের হৃদয়ে আজীবন দাগ কেটে রেখেছিল।

​একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়েও মাঠের ঘাসে ফুটবল পায়ে তাঁর এই বিচরণ প্রমাণ করে তিনি কতখানি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর এই আজীবন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল স্থানীয় খেলাধুলার প্রসারে।

LinkedIn Link

https://bit.ly/4wSQOQC

​তিনি দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সুনামের সাথে তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাব-এর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের মাঝে খেলাধুলার বীজ বুনে দিয়ে তাদের সুস্থ ধারার জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

​শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তারকে জাহিদ মীর কোনো সাধারণ পেশا হিসেবে নেননি, বরং একে নিয়েছিলেন জীবনের পরম ব্রত, সাধনা ও ইবাদত হিসেবে। একজন আদর্শবান, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ, পরম মমতাময়ী এবং দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি মানিকগঞ্জের সিংজুরী হাই স্কুল এবং তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনকে পরম দক্ষতায় পরিচালনা করেন।

​তাঁর আলোকোজ্জ্বল সান্নিধ্যে এসে এই অঞ্চলের হাজারো অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর এই গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের সুউচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পদার্পণ করেন এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল (অধ্যক্ষ) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

​একজন সুযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবক হিসেবে তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই শিক্ষার মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর ছাত্ররাই আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে তাঁরই শেখানো আদর্শের জানান দিচ্ছেন।

​জাহিদ মীর শুধু চার দেয়ালের শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজের একজন অগ্রগামী দূরদর্শী সংস্কারক। এলাকার যেকোনো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, সালিশ-বিচার কিংবা দরিদ্র মানুষের সাহায্যে তিনি সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

​সমাজে ন্যায়ের শাসন ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা। তিনি নিজের জীবনে কোনোদিন কোনো ছোট কিংবা বড় অন্যায়কে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেননি এবং অন্যায়ের সাথে কখনো কোনো আপস করেননি।

​সমাজের যত বড় প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিই হোক না কেন, যেকোনো অবিচার, জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বর সবসময় বজ্রের মতো গর্জে উঠত। তাঁর এই আপসহীন, অনমনীয় ও ন্যায়পরায়ণ মনোভাবের কারণে সাধারণ মানুষ যেকোনো বিপদে-আপদে সবার আগে জাহিদ মাস্টারের দ্বারে এসে দাঁড়াত এবং পরম ভরসা ও সঠিক বিচার পেত।

​জাহিদ মাস্টারের চরিত্রের অন্যতম সুউচ্চ, মহৎ ও মানবিক গুণ ছিল তাঁর প্রগাঢ় অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। তিনি মানুষকে কখনো ধর্ম, বর্ণ, জাত বা কূলের বেড়াজালে বিচার করতেন না। হিন্দু, মুসলিম—সবার প্রতি তাঁর ছিল সুগভীর ভালোবাসা ও আত্মিক শ্রদ্ধাবোধ।

​তেরশ্রী এবং সংলগ্ন এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি আজীবন ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর এই প্রগতিশীল চেতনা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্যবাদী রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তৎকালীন অঞ্চলের বেশ কয়েকজন প্রবাদপ্রতিম শিক্ষানুরাগী ও বিপ্লবীর সাথে তাঁর গভীর ও ঘনিষ্ঠ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

​বিশেষ করে কমরেড মন্তোষ কুমার পাল, যিনি কোনো অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ছিলেন তৎকালীন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক অনন্য সংগ্রামী কমরেড এবং একজন অত্যন্ত আদর্শবান শিক্ষক।

​কমরেড আবদুল হাকিম মাস্টার ছিলেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, মহান ভাষা সৈনিক, কমরেড মন্তোষ কুমার পাল (মন্তোষ মাস্টার) এবং জাহিদ মাস্টারের সুহৃদ সহযোদ্ধা।

​এছাড়া বিজয় চন্দ্র শীল ছিলেন তেরশ্রী অঞ্চলের গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের আরেক অগ্রগামী ও নিবেদিতপ্রাণ ধ্রুবতারা। এই প্রজ্ঞাবান মানুষগুলো একসঙ্গে মিলে মানিকগঞ্জের ঘিওর-তেরশ্রী অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল রাজনীতির এক অভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

​তারা ছিলেন একে অপরের পরম সুহৃদ, চিন্তার সঙ্গী এবং যেকোনো সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি।

Face book Link

https://bit.ly/4zAkmVy

ছাত্রজীবন থেকেই জাহিদ মীর প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী চেতনায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তৎকালীন শোষিত মানুষের একমাত্র ভরসা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র একজন সক্রিয়, একনিষ্ঠ এবং প্রথম সারির রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন।

​কোনো পদ-পদবি, সস্তা খ্যাতি বা ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি আজীবন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে লড়াই করেছেন।

​মানিকগঞ্জের মেহনতি কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি স্থানীয় ‘কৃষক আন্দোলন’-এর অগ্রভাগে থেকে বুক চিতিয়ে নেতৃত্ব দেন। তৎকালীন জোতদার ও শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন লড়াই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী ও জনপ্রিয় নেতার আসনে বসিয়েছিল।

​মোহাম্মদ জাহিদ মীরের আলো শুধু দেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সুদূর প্রবাসেও। তাঁর সুযোগ্য পুত্র আজ একজন গর্বিত ব্রিটিশ নাগরিক এবং তিনি সপরিবারে লন্ডনে বসবাস করছেন।

​অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যখন তাঁর সন্তানের বয়স মাত্র আড়াই থেকে সাড়ে তিন বছর, তখনই এই মহান মানুষটি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে যান।

​তবে তাঁর রক্ত ও আদর্শের ধারা সচল রয়েছে দেশেও; জাহিদ মাস্টারের কন্যা সাথী বাংলাদেশে সপরিবারে বসবাস করে তাঁর বাবার স্মৃতি ও আদর্শকে আগলে রেখে চলেছেন।

​আজ জাহিদ মাস্টার সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ঘিওর-তেরশ্রীর বাতাসে আজো যেন তাঁর পদচিহ্ন ও স্মৃতির সুবাস মিশে আছে। তাঁর চলে যাওয়ার শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।

​এلاকার বয়োবৃদ্ধরা এখনো যখন তেরশ্রী স্কুলের বারান্দায় কিংবা তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে বসেন, তাঁদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে জাহিদ মাস্টারের স্মৃতিতে।

​মীর মুরাদ হোসেন, জেসমিন সুলতানা সাথী ও পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁদের বাবার সোনালী স্মৃতি হাতড়াতে যান, তখন বুকভাঙ্গা হাহাকারে মন ভারী হয়ে ওঠে।

​অগ্নিকাণ্ডের সেই লেলিহান শিখা তাঁর বাড়ি পুড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে মানুষটি নিজের জীবনের সোনালী সময় বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের তরে, তাঁর মহান কীর্তি ও স্মৃতিকে পোড়ানোর ক্ষমতা কোনো আগুনের নেই।

​এলাকার মানুষের মুখে মুখে আজো ফেরে তাঁর সেই আপসহীন নীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর অতি সাধারণ জীবনের গৌরবগাথা গল্পগুলো।

​তিনি রেখে গেছেন এমন এক শূন্যতা, যা মানিকগঞ্জবাসীকে আজীবন এক সুগভীর শ্রদ্ধায় ও হাহাকারে আচ্ছন্ন করে রাখবে।

​মোহাম্মদ জাহিদ মীর কেবল একজন ব্যক্তি বা শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অবিনাশী আদর্শ এবং মানিকগঞ্জের আলো ছড়ানো এক জীবন্ত বাতিঘর।

​শত দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ডে নথিপত্র হারানোর ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও তাঁর আদর্শের যে সুবাস তাঁর সন্তান, সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী আজও বুকে ধারণ করে আছেন, তা চির অম্লান।

​শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রগতিশীল রাজনীতি, সামাজিক সংস্কার, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অনন্য ও মহিমান্বিত অবদান ঘিওর তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল পরম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে।

​তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

​লেখার সমাপনী ভাবনা

​আজ যখন মোহাম্মদ জাহিদ মীরের বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন কেবল একজন ব্যক্তির প্রয়াণের দীর্ঘশ্বাসই অনুভূত হয় না, বরং তাঁর আদর্শের আলোয় আলোকিত এক উজ্জ্বল প্রদীপশিখাও চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

​সময়ের স্রোতে অনেক মানুষই হারিয়ে যান, কালের অতল গহ্বরে মিলিয়ে যায় তাঁদের সাধারণ অর্জন; কিন্তু জাহিদ মাস্টারের মতো মানুষেরা তাঁদের কর্ম, সততা, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বলে মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে অমরত্ব লাভ করেন।

​মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা যখন তেরশ্রী হাইস্কুলে অবস্থান করতেন, তখন জাহিদ মীর ও তাঁর ভাই ইব্রাহিম মীর নিজ বাড়ি থেকে পরম যত্নে খাবার রান্না করে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পৌঁছে দিয়ে আসতেন—যা তাঁদের দেশপ্রেম ও মানবতাবাদের এক অনন্য দীপ্তিময় নিদর্শন।

​পরবর্তীতে জাহিদ মীরের বাড়িতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর জীবনের বহু মূল্যবান ডকুমেন্টস ও নানান ঐতিহাসিক তথ্য পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় অনেক অমূল্য তথ্য আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে এবং চাইলেও সেগুলোর বিস্তারিত আর পাওয়া সম্ভব হয়নি।

​তবুও শত প্রতিকূলতা, অগ্নিকাণ্ডের নিষ্ঠুর আঘাত কিংবা স্বজন হারানোর বেদনাও তাঁর মহান কীরতিকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং তাঁর সুযোগ্য সন্তান প্রবাসের মাটিতে থেকেও এবং কন্যা দেশের মাটিতে বাবার স্মৃতি বুকে ধারণ করে সেই আদর্শেরই বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন।

​জাহিদ মাস্টার কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বা নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; তিনি মানিকগঞ্জ তথা বাংলার মানুষের মনের নিকট এক শাশ্বত প্রেরণা।

​যতদিন সমাজে ন্যায়বিচার, শিক্ষা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকুলতা বেঁচে থাকবে, ততদিন জাহিদ মাস্টার বেঁচে থাকবেন প্রতিটি প্রগতিশীল প্রাণের মননে, স্মরণে ও ভালোবাসায়।

​বিশেষ কৃতজ্ঞতা

​এই জীবনলেখ্যটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পরম শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ জাহিদ মীরের বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অজানা অধ্যায়, পারিবারিক ইতিহাস ও প্রামাণিক তথ্য দিয়ে যারা অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ।

​বিশেষ করে মরহুমের সুযোগ্য পুত্র মীর মুরাদ হোসেন, সুযোগ্য কন্যা মীর সাথী এবং স্নেহাস্পদ ভাতিজা মীর বিপ্লব—তাঁদের প্রত্যেকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিবিড় প্রচেষ্টাই এই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটিকে পূর্ণতা দান করেছে।

​তাঁদের এই মহৎ উদ্যোগের ফলেই জাহিদ মাস্টারের অমর আদর্শ ও বর্ণিল জীবন আজকের প্রজন্মের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

​কপিরাইট স্বত্ব

​© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই লেখার যেকোনো অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ লেখকের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো মুদ্রণ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো প্রকাশনায় পুনরুৎপাদন, প্রকাশ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে তথ্যসূত্র উল্লেখ করে শিক্ষা বা গবেষণামূলক কাজে এটি শেয়ার করা যাবে।

Google Sites Link

https://sites.google.com/view/pijushjournalist

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

হরিরামপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, ৪ জেলের ৭ দিনের কারাদণ্ড।

মোহাম্মদ জাহিদ মীরের প্রদীপ্ত জীবনগাথা ও পারিবারিক পরিচিতি

জননেতা ও শিক্ষক: মোহাম্মদ জাহিদ মীর [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-৭]

Update Time : ০৪:৫৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

“কীর্তিমানের মৃত্যু নেই”—এই কালজয়ী উক্তিটি যাঁর জীবনের প্রতিটি ছত্রে সত্য হয়ে ধরা দেয়, তিনি হলেন মানিকগঞ্জের গর্ব, জননন্দিত শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগণ্য সংগঠক মোহাম্মদ জাহিদ মীর। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘জাহিদ মাস্টার’ নামেই পরম শ্রদ্ধা, অবিনাশী ভক্তি ও ভালোবাসার আসনে অবিচল।

​মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার ১ নম্বর পয়লা ইউনিয়নের ছোট পয়লা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী, সংস্কৃতিমনা ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দরবেশ মীর ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী, দানশীল ও ন্যায়পরায়ণ একজন মানুষ এবং মাতা সাহাতন বেগম ছিলেন এক রত্নগর্ভা জননী। চার ভাইয়ের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল তৃতীয়।

​তাঁর অন্য ভাইয়েরা হলেন সৈয়দ আলী মীর, ইব্রাহিম মীর এবং আমজাদ হোসেন মীর। এই মীর পরিবারটি শুধু এলাকায় নয়, গোটা মানিকগঞ্জ জুড়েই সততা, দেশপ্রেম, শিক্ষানুরাগ এবং আভিজাত্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে সর্বস্বীকৃত ছিল।

Medium Link

https://bit.ly/4qDzkG7

জাহিদ মীর ছিলেন মেধা, প্রজ্ঞা ও মননের এক দুর্লভ ও অনন্য সমন্বয়। তৎকালীন সময়ে যখন উচ্চশিক্ষা ছিল এক পরম সৌভাগ্যের ও দুষ্কর বিষয়, তখন তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইংরেজি—উভয় বিষয়েই অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর (ডাবল এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।

​তাঁর এই অগাধ পাণ্ডিত্য, প্রখর মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমগ্র জেলায় এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানকে আকাশচুম্বী করে তুলেছিল।

​প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। একজন তুখোড়, ক্ষিপ্রগতির ফুটবলপ্রেমী এবং অসামান্য দক্ষ ফুটবলার হিসেবে দেশজুড়ে তাঁর ব্যাপক সুনাম ছিল।

​তাঁের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও অবিসংবাদিত ‘মোহনবাগান’ ক্লাব নিজেদের দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। মোহনবাগানের জার্সি গায়ে তাঁর সেই ফুটবলশৈলী তৎকালীন ক্রীড়ামোদী মানুষের হৃদয়ে আজীবন দাগ কেটে রেখেছিল।

​একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়েও মাঠের ঘাসে ফুটবল পায়ে তাঁর এই বিচরণ প্রমাণ করে তিনি কতখানি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর এই আজীবন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল স্থানীয় খেলাধুলার প্রসারে।

LinkedIn Link

https://bit.ly/4wSQOQC

​তিনি দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সুনামের সাথে তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাব-এর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের মাঝে খেলাধুলার বীজ বুনে দিয়ে তাদের সুস্থ ধারার জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

​শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তারকে জাহিদ মীর কোনো সাধারণ পেশا হিসেবে নেননি, বরং একে নিয়েছিলেন জীবনের পরম ব্রত, সাধনা ও ইবাদত হিসেবে। একজন আদর্শবান, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ, পরম মমতাময়ী এবং দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি মানিকগঞ্জের সিংজুরী হাই স্কুল এবং তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনকে পরম দক্ষতায় পরিচালনা করেন।

​তাঁর আলোকোজ্জ্বল সান্নিধ্যে এসে এই অঞ্চলের হাজারো অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর এই গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের সুউচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পদার্পণ করেন এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল (অধ্যক্ষ) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

​একজন সুযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবক হিসেবে তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই শিক্ষার মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর ছাত্ররাই আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে তাঁরই শেখানো আদর্শের জানান দিচ্ছেন।

​জাহিদ মীর শুধু চার দেয়ালের শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজের একজন অগ্রগামী দূরদর্শী সংস্কারক। এলাকার যেকোনো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, সালিশ-বিচার কিংবা দরিদ্র মানুষের সাহায্যে তিনি সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

​সমাজে ন্যায়ের শাসন ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা। তিনি নিজের জীবনে কোনোদিন কোনো ছোট কিংবা বড় অন্যায়কে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেননি এবং অন্যায়ের সাথে কখনো কোনো আপস করেননি।

​সমাজের যত বড় প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিই হোক না কেন, যেকোনো অবিচার, জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বর সবসময় বজ্রের মতো গর্জে উঠত। তাঁর এই আপসহীন, অনমনীয় ও ন্যায়পরায়ণ মনোভাবের কারণে সাধারণ মানুষ যেকোনো বিপদে-আপদে সবার আগে জাহিদ মাস্টারের দ্বারে এসে দাঁড়াত এবং পরম ভরসা ও সঠিক বিচার পেত।

​জাহিদ মাস্টারের চরিত্রের অন্যতম সুউচ্চ, মহৎ ও মানবিক গুণ ছিল তাঁর প্রগাঢ় অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। তিনি মানুষকে কখনো ধর্ম, বর্ণ, জাত বা কূলের বেড়াজালে বিচার করতেন না। হিন্দু, মুসলিম—সবার প্রতি তাঁর ছিল সুগভীর ভালোবাসা ও আত্মিক শ্রদ্ধাবোধ।

​তেরশ্রী এবং সংলগ্ন এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি আজীবন ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর এই প্রগতিশীল চেতনা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্যবাদী রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তৎকালীন অঞ্চলের বেশ কয়েকজন প্রবাদপ্রতিম শিক্ষানুরাগী ও বিপ্লবীর সাথে তাঁর গভীর ও ঘনিষ্ঠ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

​বিশেষ করে কমরেড মন্তোষ কুমার পাল, যিনি কোনো অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ছিলেন তৎকালীন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক অনন্য সংগ্রামী কমরেড এবং একজন অত্যন্ত আদর্শবান শিক্ষক।

​কমরেড আবদুল হাকিম মাস্টার ছিলেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, মহান ভাষা সৈনিক, কমরেড মন্তোষ কুমার পাল (মন্তোষ মাস্টার) এবং জাহিদ মাস্টারের সুহৃদ সহযোদ্ধা।

​এছাড়া বিজয় চন্দ্র শীল ছিলেন তেরশ্রী অঞ্চলের গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের আরেক অগ্রগামী ও নিবেদিতপ্রাণ ধ্রুবতারা। এই প্রজ্ঞাবান মানুষগুলো একসঙ্গে মিলে মানিকগঞ্জের ঘিওর-তেরশ্রী অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল রাজনীতির এক অভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

​তারা ছিলেন একে অপরের পরম সুহৃদ, চিন্তার সঙ্গী এবং যেকোনো সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি।

Face book Link

https://bit.ly/4zAkmVy

ছাত্রজীবন থেকেই জাহিদ মীর প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী চেতনায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তৎকালীন শোষিত মানুষের একমাত্র ভরসা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র একজন সক্রিয়, একনিষ্ঠ এবং প্রথম সারির রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন।

​কোনো পদ-পদবি, সস্তা খ্যাতি বা ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি আজীবন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে লড়াই করেছেন।

​মানিকগঞ্জের মেহনতি কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি স্থানীয় ‘কৃষক আন্দোলন’-এর অগ্রভাগে থেকে বুক চিতিয়ে নেতৃত্ব দেন। তৎকালীন জোতদার ও শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন লড়াই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী ও জনপ্রিয় নেতার আসনে বসিয়েছিল।

​মোহাম্মদ জাহিদ মীরের আলো শুধু দেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সুদূর প্রবাসেও। তাঁর সুযোগ্য পুত্র আজ একজন গর্বিত ব্রিটিশ নাগরিক এবং তিনি সপরিবারে লন্ডনে বসবাস করছেন।

​অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যখন তাঁর সন্তানের বয়স মাত্র আড়াই থেকে সাড়ে তিন বছর, তখনই এই মহান মানুষটি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে যান।

​তবে তাঁর রক্ত ও আদর্শের ধারা সচল রয়েছে দেশেও; জাহিদ মাস্টারের কন্যা সাথী বাংলাদেশে সপরিবারে বসবাস করে তাঁর বাবার স্মৃতি ও আদর্শকে আগলে রেখে চলেছেন।

​আজ জাহিদ মাস্টার সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ঘিওর-তেরশ্রীর বাতাসে আজো যেন তাঁর পদচিহ্ন ও স্মৃতির সুবাস মিশে আছে। তাঁর চলে যাওয়ার শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।

​এلاকার বয়োবৃদ্ধরা এখনো যখন তেরশ্রী স্কুলের বারান্দায় কিংবা তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে বসেন, তাঁদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে জাহিদ মাস্টারের স্মৃতিতে।

​মীর মুরাদ হোসেন, জেসমিন সুলতানা সাথী ও পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁদের বাবার সোনালী স্মৃতি হাতড়াতে যান, তখন বুকভাঙ্গা হাহাকারে মন ভারী হয়ে ওঠে।

​অগ্নিকাণ্ডের সেই লেলিহান শিখা তাঁর বাড়ি পুড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে মানুষটি নিজের জীবনের সোনালী সময় বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের তরে, তাঁর মহান কীর্তি ও স্মৃতিকে পোড়ানোর ক্ষমতা কোনো আগুনের নেই।

​এলাকার মানুষের মুখে মুখে আজো ফেরে তাঁর সেই আপসহীন নীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর অতি সাধারণ জীবনের গৌরবগাথা গল্পগুলো।

​তিনি রেখে গেছেন এমন এক শূন্যতা, যা মানিকগঞ্জবাসীকে আজীবন এক সুগভীর শ্রদ্ধায় ও হাহাকারে আচ্ছন্ন করে রাখবে।

​মোহাম্মদ জাহিদ মীর কেবল একজন ব্যক্তি বা শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অবিনাশী আদর্শ এবং মানিকগঞ্জের আলো ছড়ানো এক জীবন্ত বাতিঘর।

​শত দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ডে নথিপত্র হারানোর ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও তাঁর আদর্শের যে সুবাস তাঁর সন্তান, সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী আজও বুকে ধারণ করে আছেন, তা চির অম্লান।

​শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রগতিশীল রাজনীতি, সামাজিক সংস্কার, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অনন্য ও মহিমান্বিত অবদান ঘিওর তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল পরম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে।

​তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

​লেখার সমাপনী ভাবনা

​আজ যখন মোহাম্মদ জাহিদ মীরের বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন কেবল একজন ব্যক্তির প্রয়াণের দীর্ঘশ্বাসই অনুভূত হয় না, বরং তাঁর আদর্শের আলোয় আলোকিত এক উজ্জ্বল প্রদীপশিখাও চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

​সময়ের স্রোতে অনেক মানুষই হারিয়ে যান, কালের অতল গহ্বরে মিলিয়ে যায় তাঁদের সাধারণ অর্জন; কিন্তু জাহিদ মাস্টারের মতো মানুষেরা তাঁদের কর্ম, সততা, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বলে মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে অমরত্ব লাভ করেন।

​মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা যখন তেরশ্রী হাইস্কুলে অবস্থান করতেন, তখন জাহিদ মীর ও তাঁর ভাই ইব্রাহিম মীর নিজ বাড়ি থেকে পরম যত্নে খাবার রান্না করে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পৌঁছে দিয়ে আসতেন—যা তাঁদের দেশপ্রেম ও মানবতাবাদের এক অনন্য দীপ্তিময় নিদর্শন।

​পরবর্তীতে জাহিদ মীরের বাড়িতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর জীবনের বহু মূল্যবান ডকুমেন্টস ও নানান ঐতিহাসিক তথ্য পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় অনেক অমূল্য তথ্য আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে এবং চাইলেও সেগুলোর বিস্তারিত আর পাওয়া সম্ভব হয়নি।

​তবুও শত প্রতিকূলতা, অগ্নিকাণ্ডের নিষ্ঠুর আঘাত কিংবা স্বজন হারানোর বেদনাও তাঁর মহান কীরতিকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং তাঁর সুযোগ্য সন্তান প্রবাসের মাটিতে থেকেও এবং কন্যা দেশের মাটিতে বাবার স্মৃতি বুকে ধারণ করে সেই আদর্শেরই বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন।

​জাহিদ মাস্টার কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বা নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; তিনি মানিকগঞ্জ তথা বাংলার মানুষের মনের নিকট এক শাশ্বত প্রেরণা।

​যতদিন সমাজে ন্যায়বিচার, শিক্ষা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকুলতা বেঁচে থাকবে, ততদিন জাহিদ মাস্টার বেঁচে থাকবেন প্রতিটি প্রগতিশীল প্রাণের মননে, স্মরণে ও ভালোবাসায়।

​বিশেষ কৃতজ্ঞতা

​এই জীবনলেখ্যটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পরম শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ জাহিদ মীরের বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অজানা অধ্যায়, পারিবারিক ইতিহাস ও প্রামাণিক তথ্য দিয়ে যারা অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ।

​বিশেষ করে মরহুমের সুযোগ্য পুত্র মীর মুরাদ হোসেন, সুযোগ্য কন্যা মীর সাথী এবং স্নেহাস্পদ ভাতিজা মীর বিপ্লব—তাঁদের প্রত্যেকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিবিড় প্রচেষ্টাই এই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটিকে পূর্ণতা দান করেছে।

​তাঁদের এই মহৎ উদ্যোগের ফলেই জাহিদ মাস্টারের অমর আদর্শ ও বর্ণিল জীবন আজকের প্রজন্মের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

​কপিরাইট স্বত্ব

​© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই লেখার যেকোনো অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ লেখকের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো মুদ্রণ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো প্রকাশনায় পুনরুৎপাদন, প্রকাশ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে তথ্যসূত্র উল্লেখ করে শিক্ষা বা গবেষণামূলক কাজে এটি শেয়ার করা যাবে।

Google Sites Link

https://sites.google.com/view/pijushjournalist