০৩:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
২২টি সুসজ্জিত নৌকার তীব্র প্রতিযোগিতা; বিজয়ী দলের মাঝিদের জন্য ৪টি মোটরসাইকেলসহ আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ

কালীগঙ্গায় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ: ৫ লক্ষাধিক মানুষের ঢলে উৎসবের আমেজ, চ্যাম্পিয়ন কুড়িগ্রামের ‘মায়ের দোয়া’

আবহমান গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মানিকগঞ্জের বেউথা ঘাটে কালীগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জমজমাট ও ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা. ৩ অক্টোবর শনিবার দুপুরে জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পুরো মানিকগঞ্জ শহর ও নদীর দুই পাড়ে নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল. দুপুরের পর থেকেই নদীর দুই কূল রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

শনিবার বিকেলে বর্ণিল ও ক্ষিপ্রগতির এই ক্রীড়া উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা. এর আগে, প্রতিযোগিতার সার্বিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে শুক্রবার মধ্যরাতেও তিনি সরেজমিনে ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন।

নৌকা বাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ. ত. ম. জহীর আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম. অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য-সচিব মো. মাসুদ পারভেজ।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এবারের প্রতিযোগিতায় মানিকগঞ্জ ছাড়াও কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর এবং পাবনার সাঁথিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মোট ২২টি সুসজ্জিত ও দ্রুতগতির ঐতিহ্যবাহী নৌকা অংশ নেয়. প্রতিযোগিতায় খেল্লা-গয়ইটা ১০টি, ঘাসি-ছিপা ৫টি, ছান্দি ৪টি এবং পানসি ৩টি নৌকা আলাদা ক্যাটাগরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে. এর বাইরে ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি নজরকাড়া কলাগাছের ভেলা দর্শনার্থীদের বাড়তি আনন্দ দেয়।

প্রতিযোগিতায় মূল আকর্ষণ ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে দীর্ঘ ৩ দিন নদীপথ পাড়ি দিয়ে আসা খেল্লা নৌকা ‘মায়ের দোয়া’. ভারতের তৈরিকৃত মূল্যবান শাল কাঠ দিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নৌকাটি মাঝিদের দুর্দান্ত বৈঠার ছন্দে ও গতিতে সবাইকে পেছনে ফেলে চূড়ান্তভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

নৌকার ধরন ও ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিজয়ীদের মাঝে আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়. খেল্লা-গয়ইটা এবং ঘাসি-ছিপা বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ছিল ১০০ সিসি মোটরসাইকেল এবং ছান্দি ও পানসি বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক বাইক. রানারআপ ও অন্যান্য স্থান অধিকারীদের জন্য ছিল ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ নানা সামগ্রী. এছাড়া প্রতিটি অংশগ্রহণকারী নৌকার জন্যই ছিল ঐতিহ্যবাহী পিতলের কাপ ও ফ্রিজ পুরস্কার. ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ ক্যাটাগরিতেও আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়া হয়।

নদীর বুকে মাঝিদের হেলেদুলে বৈঠা চালানোর চমৎকার দৃশ্য আর কাঁসা-করতালের সাথে জারি-সারির সুরে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে. দর্শনার্থীদের করতালিতে মুখর কালীগঙ্গার দুই তীরের মানুষের দাবি, গ্রামীণ এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি বছরই যেন এমন আয়োজন অব্যাহত রাখা হয়।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুবসমাজকে মাদক, মোবাইল আসক্তি ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রেখে সুস্থ বিনোদন দিতে এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই বিশাল আয়োজন, যা আগামীতেও ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

হরিরামপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, ৪ জেলের ৭ দিনের কারাদণ্ড।

২২টি সুসজ্জিত নৌকার তীব্র প্রতিযোগিতা; বিজয়ী দলের মাঝিদের জন্য ৪টি মোটরসাইকেলসহ আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ

কালীগঙ্গায় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ: ৫ লক্ষাধিক মানুষের ঢলে উৎসবের আমেজ, চ্যাম্পিয়ন কুড়িগ্রামের ‘মায়ের দোয়া’

Update Time : ০৪:৫৬:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

আবহমান গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মানিকগঞ্জের বেউথা ঘাটে কালীগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জমজমাট ও ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা. ৩ অক্টোবর শনিবার দুপুরে জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পুরো মানিকগঞ্জ শহর ও নদীর দুই পাড়ে নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল. দুপুরের পর থেকেই নদীর দুই কূল রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

শনিবার বিকেলে বর্ণিল ও ক্ষিপ্রগতির এই ক্রীড়া উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা. এর আগে, প্রতিযোগিতার সার্বিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে শুক্রবার মধ্যরাতেও তিনি সরেজমিনে ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন।

নৌকা বাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ. ত. ম. জহীর আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম. অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য-সচিব মো. মাসুদ পারভেজ।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এবারের প্রতিযোগিতায় মানিকগঞ্জ ছাড়াও কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর এবং পাবনার সাঁথিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মোট ২২টি সুসজ্জিত ও দ্রুতগতির ঐতিহ্যবাহী নৌকা অংশ নেয়. প্রতিযোগিতায় খেল্লা-গয়ইটা ১০টি, ঘাসি-ছিপা ৫টি, ছান্দি ৪টি এবং পানসি ৩টি নৌকা আলাদা ক্যাটাগরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে. এর বাইরে ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি নজরকাড়া কলাগাছের ভেলা দর্শনার্থীদের বাড়তি আনন্দ দেয়।

প্রতিযোগিতায় মূল আকর্ষণ ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে দীর্ঘ ৩ দিন নদীপথ পাড়ি দিয়ে আসা খেল্লা নৌকা ‘মায়ের দোয়া’. ভারতের তৈরিকৃত মূল্যবান শাল কাঠ দিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নৌকাটি মাঝিদের দুর্দান্ত বৈঠার ছন্দে ও গতিতে সবাইকে পেছনে ফেলে চূড়ান্তভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

নৌকার ধরন ও ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিজয়ীদের মাঝে আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়. খেল্লা-গয়ইটা এবং ঘাসি-ছিপা বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ছিল ১০০ সিসি মোটরসাইকেল এবং ছান্দি ও পানসি বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক বাইক. রানারআপ ও অন্যান্য স্থান অধিকারীদের জন্য ছিল ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ নানা সামগ্রী. এছাড়া প্রতিটি অংশগ্রহণকারী নৌকার জন্যই ছিল ঐতিহ্যবাহী পিতলের কাপ ও ফ্রিজ পুরস্কার. ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ ক্যাটাগরিতেও আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়া হয়।

নদীর বুকে মাঝিদের হেলেদুলে বৈঠা চালানোর চমৎকার দৃশ্য আর কাঁসা-করতালের সাথে জারি-সারির সুরে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে. দর্শনার্থীদের করতালিতে মুখর কালীগঙ্গার দুই তীরের মানুষের দাবি, গ্রামীণ এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি বছরই যেন এমন আয়োজন অব্যাহত রাখা হয়।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুবসমাজকে মাদক, মোবাইল আসক্তি ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রেখে সুস্থ বিনোদন দিতে এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই বিশাল আয়োজন, যা আগামীতেও ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।