মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় পরকীয়া সম্পর্কের জেরে ভাবি ও ৬ বছরের শিশু ভাতিজাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করার চাঞ্চল্যকর মামলায় দেবর সোলাইমান হোসেনকে (৩৪) ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে আসামির উপস্থিতিতে মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস কে এম তোফায়েল হাসান এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত সোলাইমান হোসেন সাটুরিয়া উপজেলার সাফুল্লী (উত্তর কাউন্নারা) গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, প্রবাসী আশরাফ আলী ওরফে মজনুর স্ত্রী পারভীন আক্তারের (২৫) সঙ্গে তাঁর আপন দেবর সোলাইমান হোসেনের পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে পারভীন সোলাইমানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তাঁদের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই জেরে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টা থেকে পরদিন ৯ জানুয়ারি সকাল ৬টার মধ্যে যেকোনো সময় নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পারভীন আক্তারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন সোলাইমান। এ সময় হত্যাকাণ্ডটি দেখে ফেলায় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পারভীনের ৬ বছর বয়সী শিশু সন্তান আব্দুল নূরকেও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে নিহত পারভীন আক্তারের মা মজিরন বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সাটুরিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে পুলিশ দেবর সোলাইমান হোসেনকে গ্রেপ্তার করলে তিনি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালাম ২০২০ সালের ১৪ মে সোলাইমানকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোট ৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আজ এই রায় প্রদান করেন।
এদিকে জোড়া খুনের মতো নৃশংস ও স্পর্শকাতর মামলায় আসামির মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আ ফ ম নূরতাজ আলম বাহার বলেন, “যেহেতু এটি একটি ডাবল মার্ডার মামলা এবং আসামি নিজে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন, তাই আমরা সর্বোচ্চ শাস্তির আশা করেছিলাম। কিন্তু মাননীয় আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা করে মামলার ধারা পরিবর্তন করে এই অপর্যাপ্ত সাজা প্রদান করেছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমরা মোটেও সন্তুষ্ট নই। আমরা দ্রুতই এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) আপিল করব।”
অন্যদিকে রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম দাবি করেন, “মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) অতিউৎসাহি হয়ে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসার আগেই তড়িঘড়ি করে চার্জশিট জমা দিয়েছিলেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও ফরেনসিক টেস্টের পর আদালতে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। আমরা মনে করি এটি একটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায় হয়েছে এবং এখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। ন্যায়বিচার পেতে আমরাও এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।”
পিযুষ পাল, স্টাফ রিপোর্টার 


















