বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, প্রখ্যাত দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী অমর্ত্য কুমার সেন আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের জ্ঞানজগতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জ্যোতিষ্ক। কল্যাণমুখী অর্থনীতি, সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দুর্ভিক্ষের আর্থ-সামাজিক মেকানিজম উন্মোচন এবং বিশ্বব্যাপী মানব উন্নয়ন সূচক গঠনে তাঁর বৈপ্লবিক অবদান মানব সভ্যতার চিন্তা ও দর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
প্রথাগত পুঁজিবাদী বা সংখ্যাভিত্তিক অর্থনীতি যেখানে কেবল জিডিপি, ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি, বাজার, বাণিজ্যিক লগ্নি এবং মুনাফাকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি ও একমাত্র মাপকাঠি মনে করত, অমর্ত্য সেন সেখানে নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানুষের মৌলিক স্বাধীনতাকে অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দারিদ্র্যপীড়িত, শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ে তাঁর আজীবন তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ‘অর্থনীতির মাদার তেরেসা’ এবং ‘দরিদ্রদের অর্থনীতিবিদ’ বলে অভিহিত করা হয়। তিনি বিশ্বমঞ্চে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাঙালির মেধা, উদারতা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বজনীন মানবিক চেতনার এক চিরন্তন ও অক্ষয় প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এই মহান দূরদর্শী চিন্তাবিদ ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে তাঁর মাতামহের আশ্রমে এক অত্যন্ত শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর আদি পৈতৃক নিবাস এবং নাড়ির টান লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মত্ত গ্রামে, যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের বনেদি বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ‘জজ বাড়ি’ নামে পরিচিত এবং তাঁর পরিবার ছিল তৎকালীন অবিভক্ত পূর্ববঙ্গের অন্যতম সুশিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ও সমাজ সংস্কারক পরিবার।
তাঁর পিতা আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের প্রখ্যাত ও বরেণ্য অধ্যাপক, যিনি পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মা অমিতা সেন ছিলেন একজন বিদুষী নারী, প্রখ্যাত লেখিকা এবং প্রাচীন ভারতীয় নৃত্য ও সংস্কৃতির মহান পৃষ্ঠপোষক।
তাঁর জন্মের পর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে তাঁকে কোলে নিয়ে নাম রেখেছিলেন ‘অমর্ত্য’, যার সংস্কৃত ও বাংলা অর্থ হলো অমর বা যিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন এবং কবিগুরু যেন তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে শিশুটির ভবিষ্যতের বিশ্বজয়ের ইঙ্গিত আগেই দিয়ে দিয়েছিলেন।
শৈশবে তিনি তাঁর নানা, প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত, প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের প্রগাঢ় গবেষক এবং শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের সান্নিধ্যে থেকে ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, হিন্দু-মুসলিম সুফি ঐতিহ্য ও উদারনৈতিক দর্শনের দীক্ষা লাভ করেন, যা তাঁর জীবনদৃষ্টিকে সম্পূর্ণ মানবিক রূপে বিকশিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
তাঁর শিক্ষাজীবন বাংলাদেশ, ভারত ও ইংল্যান্ড—এই তিন ভূখণ্ড জুড়ে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মেধার স্বাক্ষরতায় বিস্তৃত ছিল। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ঘটে এবং পুরান ঢাকার লারমিনি স্ট্রিটের ‘জগৎ কুটির’ বাড়িতে কাটানো শৈশবের দিনগুলো ও রোমাঞ্চকর স্মৃতি তাঁর মনের গভীরে স্থায়ী আসন গেড়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমাবর্ষণের আতঙ্কের কারণে তাঁর বাবা তাঁকে ঢাকা থেকে শান্তিনিকেতনে মাতামহের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন, যেখানে প্রথাগত চার দেয়ালের বন্দিদশা ও কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে গাছের তলায় প্রকৃতির মাঝে উন্মুক্ত শ্রেণীর পড়াশোনার পরিবেশ তাঁর স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে বহুগুণ বিকশিত করে।
পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৩ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন, যেখানে তৎকালীন দেশভাগের পরবর্তী সামাজিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভারতের পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকে ১৯৫৫ সালে পুনরায় অর্থনীতিতে বিএ ও ১৯৫৯ সালে প্রখ্যাত নারী অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যার থিসিসের বিষয় ছিল প্রযুক্তির নির্বাচন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি এক মারাত্মক ও আক্রমণাত্মক মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসকেরা তাঁর বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিলেও অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি, মেডিকেল লাইব্রেরিতে গিয়ে নিজে ক্যানসারের বই পড়া এবং সঠিক রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে তিনি এই কঠিন রোগকে জয় করেন, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকে জীবনের পরবর্তী যেকোনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিচল থাকতে শিখিয়েছিল।
ডক্টরেট ডিগ্রি শেষ করার আগেই মাত্র ২৩ বছর বয়সে অমর্ত্য সেন কলকাতার নবগঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন, যা ছিল ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য রেকর্ড।
পরবর্তীতে তিনি দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্স, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব অধ্যাপনা করেন, যা ভারতের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী গবেষণার এক সোনালী অধ্যায় তৈরি করেছিল।
তিনি আমেরিকার বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও দর্শনের যৌথ অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ক্লাস নিয়েছেন এবং তিনি ছিলেন এমন এক বিরল শিক্ষক যিনি একই সাথে দুই বিভাগেই সমান আধিপত্যের সাথে সমাজ ও নীতিশাস্ত্রের মেলবন্ধন পড়াতেন।
১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জনের পর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ট্রিনিটি কলেজের ‘মাস্টার’ বা প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন এবং অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো প্রাচীন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শীর্ষ কলেজের প্রধান হওয়া তিনিই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম এশীয় এবং প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ শিক্ষাবিদ।
তার শিক্ষাজীবন,বাংলাদেশ,ভারত ও ইংল্যান্ড- এই তিন ভূখন্ড জুড়ে অত্যন্ত বয় বিস্তৃত ছিল। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ঘটে এবং পুরান ঢাকার লারমিনি স্ট্রিটের ‘জগৎ কুটির’ বাড়িতে কাটানো শৈশবের দিনগুলো ও রোমাঞ্চকর স্মৃতি তাঁর মনের গভীরে স্থায়ী আসন গেড়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমাবর্ষণের আতঙ্কের কারণে তাঁর বাবা তাঁকে ঢাকা থেকে শান্তিনিকেতনে মাতামহের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন, যেখানে প্রথাগত চার দেয়ালের বন্দিদশা ও কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে গাছের তলায় প্রকৃতির মাঝে উন্মুক্ত শ্রেণীর পড়াশোনার পরিবেশ তাঁর স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে বহুগুণ বিকশিত করে।
পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৩ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন, যেখানে তৎকালীন দেশভাগের পরবর্তী সামাজিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী ভারতের পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকে ১৯৫৫ সালে পুনরায় অর্থনীতিতে বিএ ও ১৯৫৯ সালে প্রখ্যাত নারী অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যার থিসিসের বিষয় ছিল প্রযুক্তির নির্বাচন।
পরবর্তীতে তিনি দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্স, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব অধ্যাপনা করেন, যা ভারতের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী গবেষণার এক সোনালী অধ্যায় তৈরি করেছিল।
তিনি আমেরিকার বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও দর্শনের যৌথ অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ক্লাস নিয়েছেন এবং তিনি ছিলেন এমন এক বিরল শিক্ষক যিনি একই সাথে দুই বিভাগেই সমান আধিপত্যের সাথে সমাজ ও নীতিশাস্ত্রের মেলবন্ধন পড়াতেন।
১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জনের পর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ট্রিনিটি কলেজের ‘মাস্টার’ বা প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন এবং অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো প্রাচীন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শীর্ষ কলেজের প্রধান হওয়া তিনিই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম এশীয় এবং প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ শিক্ষাবিদ।
প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়’ নতুন করে আন্তর্জাতিকভাবে চালু করার পেছনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং তিনি এর প্রথম আচার্য বা চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অমর্ত্য সেন তাঁর জীবনে তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং প্রথম দুটি সংসারে তাঁর মোট চারজন সন্তান রয়েছে। ১৯৬০ সালে প্রখ্যাত লেখিকা নবনীতা দেব সেনের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়, যা ১৯৭৬ সালে বিচ্ছেদের মাধ্যমে শেষ হয়। এই দাম্পত্য জীবনে তাঁদের দুই কন্যা সন্তান জন্ম নেন—জ্যেষ্ঠ কন্যা অন্তরা দেব সেন পেশায় একজন সফল সাংবাদিক ও সম্পাদক এবং কনিষ্ঠ কন্যা নন্দনা সেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ও শিশু অধিকার কর্মী।
প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৭৭ সালে অমর্ত্য সেন ইতালীয় অর্থনীতিবিদ ইভা কলোর্নিকে বিয়ে করেন। ১৯৮৫ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইভার অকাল মৃত্যু পর্যন্ত এই সংসার স্থায়ী ছিল। এই দ্বিতীয় দাম্পত্য জীবনেও তাঁর দুটি সন্তান রয়েছে, যাদের নাম ইন্দ্রাণী সেন ও কবির সেন। ইন্দ্রাণী সেন সাংবাদিকতা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত এবং কবির সেন আমেরিকায় সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে অমর্ত্য সেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক এমা রথসচাইল্ডকে বিয়ে করেন, যার সাথে তিনি বর্তমানে দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। এই তৃতীয় সংসারে তাঁদের কোনো সন্তান নেই।
লেখকের সমাপনী ভাবনা –
অমর্ত্য কুমার সেনের সুদীর্ঘ ও মহিমান্বিত জীবনগাথা পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তিনি কেবল একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বা দার্শনিকই নন, বরং তিনি মানবতাবাদের এক জীবন্ত বাতিঘর। প্রথাগত সংখ্যা, জটিল গাণিতিক সমীকরণ এবং পুঁজিবাদী বাজারের রূঢ় হিসাবের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ‘মানুষ’ ও তার অস্তিত্বকে তিনি পরম যত্নে অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছেন।
তাঁর পুরো জীবনের গবেষণা ও দর্শন মূলত একটি সত্যকেই বারবার উচ্চারণ করে—উন্নয়নের আসল পরিমাপ মানুষের পকেটের টাকার অঙ্কে নয়, বরং তার জীবনযাপনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার মাঝে নিহিত।১৮ বছর বয়সে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিকে পরাজিত করা থেকে শুরু করে কেমব্রিজ-হার্ভার্ডের মতো বিশ্বসেরা বিদ্যাপীঠের শীর্ষ চূড়া স্পর্শ করার এই যে মহাকাব্যিক যাত্রা, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁর অনমনীয় ইচ্ছাশক্তি এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত হয়েও তিনি কখনো তাঁর শিকড়কে বিস্মৃত হননি; মানিকগঞ্জের মত্ত গ্রামের ধূলিকণা কিংবা পুরান ঢাকার শৈশবের স্মৃতিকে তিনি আজীবন মনের মণিকোঠায় ধারণ করেছেন।
আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতায় জর্জরিত এই পৃথিবীতে অমর্ত্য সেনের উদারনৈতিক ও বহুত্ববাদী দর্শন আগের চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। অন্ধ অনুকরণ বা উগ্রতার বিপরীতে যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করার যে সাহস তিনি তরুণ প্রজন্মকে দেখিয়েছেন, তা-ই সমাজ পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার। পরিশেষে বলা যায়, অমর্ত্য কুমার সেনের মেধা, জীবন ও কর্ম বিশ্বমঞ্চে কেবল বাঙালি জাতির গৌরবকেই তুলে ধরেনি, বরং সমগ্র মানবজাতিকে এক সমতাভিত্তিক ও ন্যায়পরায়ণ পৃথিবী গড়ার চিরন্তন অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
লেখক – পিযুষ পাল,স্টাফ রিপোর্টার,দৈনিক নতুন দেশ ২৪, মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক ঢাকার ডাক।
📖 সহায়ক উৎস ও তথ্য কৃতজ্ঞতা:
Home in the World: A Memoir (অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী)
নোবেল প্রাইজ অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (nobelprize.org)
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) – মানব উন্নয়ন সূচক (HDI)
আর্কাইভহার্ভার্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ফ্যাকাল্টি প্রোফাইল
বাংলাপিডিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন (জাতীয় তথ্য বাতায়ন)
পিযুষ পাল, স্টাফ রিপোর্টার 



















