১১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি, নৌকা বাইচ এবং ঐতিহ্যবাহী লোকক্রীড়ার এক সমৃদ্ধ আখ্যান।

মানিকগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য: তেরশ্রী জনপদের সংস্কৃতি ও খেলাধুলা

​আবহমান বাংলার সংস্কৃতির একটি বিশাল দিক জুড়ে রয়েছে খেলাধুলা। নির্মল আনন্দ প্রাপ্তির জন্যই খেলাধুলার প্রচলন হলেও, পরে তা পেশায় পরিণত হয়। তেরশ্রী জনপদের (পয়লা ইউনিয়ন) বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—নৌকা বাইচ, হা-ডু-ডু খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা, লাটিম খেলা, লাঠি খেলা, গোল্লাছুট ইত্যাদি। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী খেলা ছাড়াও ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ভলিবল, ব্যাডমিন্টন খেলারও প্রচলন রয়েছে।

নৌকা বাইচ: বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মেলা, পূজা ও অন্যকোন উৎসব উপলক্ষে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হয়। একটি বাইচের নৌকায় কমপক্ষে ২০ জন বাইচাল থাকেন। বাইচের নৌকার মালিকের ঘাট থেকে ছাড়া হয়। নৌকা ছাড়ার সময় কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। নৌকার মাঝি, মাল্লা, বাইচাল, সারিদার বা বয়াতিদের নৌকায় উঠার পর বয়াতিরা বন্দনা গান গায়।

এই সময় নৌকা মালিকের বাড়ির বৌ ঝি-রা কুলা বা থালার মধ্যে ধান-দূর্বা, কয়েকটা চাউল, সিঁদুর, সামান্য পরিমাণ সরিষার তেল রাখে। জল দিয়ে নৌকার গলুই ধুইয়ে সরিষার তেল লাগায়। এছাড়া তিন, পাঁচ বা সাত ফোঁটা সিঁদুর গলুইয়ের মাথায় লাগায়। বাইচের নৌকার পেছনের গলুইতে ঠিকানাসহ মালিকের নাম লেখা হয়। নাম ঠিকানা রং দিয়ে আকর্ষণীয় করে লেখা হয়। বাইচের নৌকা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় তীরবর্তী গ্রামের লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সারিগান শোনার জন্য। ঘাটে নৌকা ভিড়াতে বলে। গান শুনে বয়াতিদের পুরস্কার প্রদান করে, বাইচালদের খাবার দেয়।

​নৌকা বাইচের অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলো তখন প্রতিযোগিতায় স্থলে উপস্থিত হয়। বিভিন্ন ধরনের নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। যেমন: খেলনা, চইরা, কুশা ইত্যাদি। তেরশ্রী জনপদের উল্লেখযোগ্য নৌকা বাইচালদের নাম: বলাই ঘরামি, মোঃ লালচান, মোঃ হাবিবুর রহমান, মোঃ তাহেজ উদ্দিন, হোসেন আলী, চিকন আলী, জুলু মাতব্বর, সৈয়দ আলী, আবেদ আলী, হারেজ, নাজেব, ওফাজ মোল্লা, বলি মোল্লা, ইয়ার, নয়ন মোল্লা প্রমুখ।

​হা-ডু-ডু খেলা: তেরশ্রী জনপদের বিভিন্ন স্থানে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ, পূজা-পার্বণ, নববর্ষকে কেন্দ্র করে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কোন উপলক্ষ ছাড়াও অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের আনন্দ-বিনোদনের ছাড়াও হা-ডু-ডু খেলা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

​হা-ডু-ডু খেলায় দুটি দল থাকে। প্রত্যেক দলে ৭ জন খেলোয়াড় থাকে। একপক্ষের খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে ডাক দেয়। কেউ বলে হা-ডু-ডু বা হা-টিক-টিক দম বন্ধ করে ডাক দিতে হয়। ডাক দিতে দিতে যদি এই খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের একজনকে স্পর্শ করে নিজের কোর্টে সে দাঁড়াতে পারেন তাহলে তার দল এক পয়েন্ট পাবেন। আর যদি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় দু’জনে ডাক দেওয়া খেলোয়াড়কে ধরে রাখতে পারে তাহলে তারা এক পয়েন্ট পাবে। এভাবে খেলা চলতে থাকে। একঘন্টা বা দুইঘন্টা সময় নির্দিষ্ট থাকে। মাঝখানে বিরতির জন্য দশ মিনিট থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোনো পক্ষের খেলোয়াড় অন্য পক্ষের খেলোয়াড়কে বেশি সংখ্যায় ছুঁতে আসতে পারে, তবে তারা জয়ী হবে। তেরশ্রী জনপদের কয়েকজন হা-ডু-ডু খেলোয়াড়ের নাম: পান্নু প্রধান, মোঃ তাহেজ উদ্দিন, রেজ্জাক, মুকুল বেপারী, কেলে ব্রাক্ষ্মণ, আহমেদ আলী, খোকা, শুকুর আলী, আনছু, বকুল, কুদ্দুস।

লাঠি খেলা: আগের দিনের জমিদারগণ নিজেদের এলাকা, সীমানা, ভূ-সম্পত্তি ও প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখবার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী রাখতেন। জমিদারগণ আত্মরক্ষা অথবা কোন সংঘাত মোকাবেলা করার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী লালন করতেন। জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর অনুকরণেই মূলত লাঠি খেলা সৃষ্টি হয়েছে। লাঠি খেলার ওস্তাদকে সরদার বলে। এই জন্য এটি ‘সরদার বাড়ি’ খেলা নামেও পরিচিত।

আগেকার দিনে ঈদের দিনে, চৈত্রসংক্রান্তিতে, বিয়ে বাড়িতে অথবা যেকোনো সাপ্তাহিক উৎসবের মধ্যে লাঠি খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল। তাছাড়া অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি শখ করে লাঠি খেলার আয়োজন করতেন। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা বা সরদারবাড়ি খেলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

​লাঠি খেলায় বিশেষ নৃত্যের তালে তালে লাঠিয়াল দল ঘুরতে থাকে। কাঁসার কলসির উপর কাঁসার থালা বাজিয়ে অথবা কখনো ‘চাপ থালা’ বাজিয়ে নৃত্যের তাল রক্ষা করা হয়। নাচের যেমন বিভিন্ন প্রকার আছে, তেমনি আছে লাঠির ও বিভিন্ন প্রকার। লাঠি খেলার অন্যতম বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ডাক’। এটা লাঠি খেলার আকর্ষণীয় বিষয়। লাঠি খেলার ডাক হচ্ছে মূলত শক্তির উৎস। ডাক দেওয়ার বিভিন্ন প্রকার আছে। ডাক দেওয়ার আগে মন্ত্র পাঠ করা হয়। এই খেলায় অনেক তন্ত্র-মন্ত্র নিয়ে কাজ করতে হয়। লাঠি খেলায় কালী সাধন আছে। এই বিশেষ সাধন করলে শরীর গরম হয়। দেহে শক্তি উৎপন্ন হয়। তেরশ্রী গ্রামের তেরশ্রী বিজয় মেলার উদ্বোধনী দিনে এই খেলা এখনো প্রদর্শিত হয়ে থাকে। তেরশ্রী জনপদের কয়েকজন লাঠি খেলোয়াড়ের নাম: বলাই ঘরামি, লালচান, হাবিবুর রহমান, হোসেন আলী, চিকন আলী, ওমর আলী, নইদ্যা, ইব্রাহিম মুন্সী, তাহেজ উদ্দিন, বলি মোল্লা, তামজ, জিন্নাহ, আক্কাস, শুকুর আলী, কিয়ামউদ্দিন, তামেজ মিয়া, লক্কু মিয়া, গোলাম মিয়া, মুনাফ ব্যাপারী, আয়নার মিয়া, চান্দু মিয়া, আনোয়ার, মফেজ, নান্নু প্রমুখ।

​ফুটবল: ফুটবল একটি দলগত খেলা। এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় খেলা। এটি দুই দলের মধ্যে খেলা হয়। যার প্রতি দলে ১১ জন খেলোয়াড় থাকে। এটি বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রচলিত খেল। ফুটবলের বেশ কিছু ভালো টিম মানিকগঞ্জের বিভিন্ন মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্ট অংশগ্রহণ করে দৃষ্টি নন্দনীয় খেলা উপহার দিয়ে দর্শকদের আনন্দ উল্লাসে মাটিয়ে তুলতো।

রহল আমিন বাচ্চু বাংলাদেশ জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান অধিকারের পাশাপাশি ফুটবলেও তার সাফল্য কম নয়। দীর্ঘদিন মানিকগঞ্জে মহকুমা ফুটবল দলে খেলেছেন। এছাড়া B.R.T.C ও বাংলাদেশ ফুটবল টিমের খেলোয়াড় হিসাবে বিভিন্ন লিগ ও টুর্নামেন্টের সকল ফুটবলার ছিলেন তিনি।

আনজু প্রধান, দূর দূরান্তে গিয়েও খেলতেন। লাউহাটি মাঠে গিয়ে বিদেশীদের বিপক্ষে একবার পাঁচ গোল করেন। ৩৬ টি দলের মধ্যে সেরা হয়েছিলেন। রহল আমিন, কর্নেল আবুল, মীর জাহিদ, কালাম মাস্টার, লেবু ঠাকুর, মীরজাহান, বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজ, কুইন্ট্যা পাগলা, বাইলজুরীর সিকান্দার, পাঁচথবীর তারা মেম্বার, পাঁচথবীর সিদ্ধেশ্বর, মনজু প্রধান, লতা প্রধান, চাল্লু ভুঁইয়া, হাবু ভুঁইয়া, সুমঙ্গল ঠাকুর, রাবু ঠাকুর, সামিউল প্রধান, বাইলজুরীর রুবেল, তেরশ্রী অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলতেন।

স্মৃতি হাতরিয়ে আঞ্জু প্রধান বলেন, অন্য গ্রামের খেলোয়াড় ও তেরশ্রী দলের হয়ে খেলতে গর্ববোধ করতেন। যেমন সিংজুরির নিম্মু, ঘিওরার শিশির ঠাকুর, তেরশ্রী দলে খেলতেন। তেরশ্রীর খেলোয়াড়গণ বিভিন্ন গ্রামে হায়ারে গিয়ে খেলতেন। দূরদুরান্ত থেকে আমরা অনেক কাপ নিয়ে এসেছি। তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষকদের মধ্যে রাধানাতবাবু (প্রধান শিক্ষক), আব্দুল হাকিম মাস্টার, মন্তোষ পাল মাস্টার, আমির মাস্টার, হাবিবুর রহমান হবি মাস্টার শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন। তেরশ্রী খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন মীর জাহিদ, হাকিম মাস্টার, কালাম মাস্টার, তৈয়ব আলী মাস্টার। ফুটবল টিম গঠনে এরা অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। পরবর্তীতে হাবু ভুঁইয়া খেলাধুলায় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

​অনিল কর, মন্তোষ কুমার পাল, পরিতোষ কুমার পাল রেফারি দিতেন। পরবর্তীতে আব্দুস সালাম, জসীম উদ্দিন, ইন্দ্রজিৎ কর কালু, রঞ্জিত শীল, ফাকির আলী, স্বপনঞ্জন দাস সুবল, বারেক মোল্লা এরা রেফারি দিতেন। এইসব লোকজন খেলাধুলা নিয়েই থাকতেন। তাদের অন্য কোন নেশা ছিল না। তারা সবসময় সেরা হতে চাইতেন এবং এইসব নিয়েই চিন্তা করতেন। গ্রামের প্রতি ভালোবাসার টানে তাদের ক্লাবে সংযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা ক্লাবমুখী হননি। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে তেরশ্রী খেলাধুলায় বেশি উন্নত ছিল।

ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলা: ক্রিকেট খেলা যুবক শ্রেণি মাঠে এবং গ্রামের ছোট খাটো ফাঁকা মাঠে বা জায়গায় এ খেলার আয়োজন করে থাকে। বর্তমানে এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এছাড়া কানামাছি, দড়ি লাফানো, হাঁড়ি ভাঙা, লুকোচুরি, কুতকুত খেলা, ইর্চি-বির্চি, ডাংগুলি খেলা, ওপেনটি বায়োস্কোপ, ছি-ব্রুড়ি, ঘুড়ি উড়ানোর প্রভূতি খেলা দেখতে পাওয়া যায়। ঘুড়ি উড়ানো বাংলার একটি জনপ্রিয় খেলা। গ্রীকালের পরন্ত বিকেলে রাখালেরা বা স্কুল ফেরৎ ছেলেমেয়েরা এ খেলা খেলে থাকে। ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতাও হয়। বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন-মানুষ ঘুড়ি, প্লেন ঘুড়ি, মাছ ঘুড়ি, সাপু ঘুড়ি, চিল ঘুড়ি, টং ঘুড়ি, পাতলা ঘুড়ি, মটর ঘুড়ি, ঢোল ঘুড়ি, তারা ঘুড়ি, কইরা ঘুড়ি, পতঙ্গা ঘুড়ি ইত্যাদি।

​বর্তমান অবস্থা: নানাবিধ কারণে খেলাধুলার চর্চার ক্ষেত্র অনেকটা কমে গেছে। তেরশ্রী জনপদের উজ্জ্বল খেলাধুলার কথা আজ বিলুপ্ত স্মৃতি। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মানুষের জীবন ধারায় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের হাওয়ায় স্বভাবতই পরিবর্তন এসেছে খেলাধুলাতেও। ক্লাবগুলোর গতিহীনতা ও সঠিক নেতৃত্বের অভাব এবং অনেকংশই দায়ী। এক সময় তেরশ্রী জনপদে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাব, পয়লা সবুজ সংঘ, বাহাদুরপুর শাপলা স্পোর্টিং ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাব গড়ে উঠেছিল। ক্লাবগুলো এখন খেলাধুলার মধ্যে নেই।

খেলাধুলায় আবার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্লাবসহ সমাজের সকল স্তরে সবাইকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। তাহলেই যুব সমাজ তার জীবনের সঠিক লক্ষ্য খুঁজে পাবে। খেলাধুলায় প্রাণ ফিরে আসুক। প্রযুক্তি নির্ভর না হয়ে তরুণসহ আবালবৃদ্ধবনিতা সুস্থ বিনোদনে ফিরে আসুক এটাই প্রত্যাশা।

লেখক-

পিযুষ পাল

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নতুন দেশ ২৪

জেলা প্রতিনিধ,দৈনিক ঢাকার ডাক

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

হরিরামপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, ৪ জেলের ৭ দিনের কারাদণ্ড।

আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি, নৌকা বাইচ এবং ঐতিহ্যবাহী লোকক্রীড়ার এক সমৃদ্ধ আখ্যান।

মানিকগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য: তেরশ্রী জনপদের সংস্কৃতি ও খেলাধুলা

Update Time : ০৪:১২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

​আবহমান বাংলার সংস্কৃতির একটি বিশাল দিক জুড়ে রয়েছে খেলাধুলা। নির্মল আনন্দ প্রাপ্তির জন্যই খেলাধুলার প্রচলন হলেও, পরে তা পেশায় পরিণত হয়। তেরশ্রী জনপদের (পয়লা ইউনিয়ন) বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—নৌকা বাইচ, হা-ডু-ডু খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা, লাটিম খেলা, লাঠি খেলা, গোল্লাছুট ইত্যাদি। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী খেলা ছাড়াও ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ভলিবল, ব্যাডমিন্টন খেলারও প্রচলন রয়েছে।

নৌকা বাইচ: বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মেলা, পূজা ও অন্যকোন উৎসব উপলক্ষে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হয়। একটি বাইচের নৌকায় কমপক্ষে ২০ জন বাইচাল থাকেন। বাইচের নৌকার মালিকের ঘাট থেকে ছাড়া হয়। নৌকা ছাড়ার সময় কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। নৌকার মাঝি, মাল্লা, বাইচাল, সারিদার বা বয়াতিদের নৌকায় উঠার পর বয়াতিরা বন্দনা গান গায়।

এই সময় নৌকা মালিকের বাড়ির বৌ ঝি-রা কুলা বা থালার মধ্যে ধান-দূর্বা, কয়েকটা চাউল, সিঁদুর, সামান্য পরিমাণ সরিষার তেল রাখে। জল দিয়ে নৌকার গলুই ধুইয়ে সরিষার তেল লাগায়। এছাড়া তিন, পাঁচ বা সাত ফোঁটা সিঁদুর গলুইয়ের মাথায় লাগায়। বাইচের নৌকার পেছনের গলুইতে ঠিকানাসহ মালিকের নাম লেখা হয়। নাম ঠিকানা রং দিয়ে আকর্ষণীয় করে লেখা হয়। বাইচের নৌকা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় তীরবর্তী গ্রামের লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সারিগান শোনার জন্য। ঘাটে নৌকা ভিড়াতে বলে। গান শুনে বয়াতিদের পুরস্কার প্রদান করে, বাইচালদের খাবার দেয়।

​নৌকা বাইচের অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলো তখন প্রতিযোগিতায় স্থলে উপস্থিত হয়। বিভিন্ন ধরনের নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। যেমন: খেলনা, চইরা, কুশা ইত্যাদি। তেরশ্রী জনপদের উল্লেখযোগ্য নৌকা বাইচালদের নাম: বলাই ঘরামি, মোঃ লালচান, মোঃ হাবিবুর রহমান, মোঃ তাহেজ উদ্দিন, হোসেন আলী, চিকন আলী, জুলু মাতব্বর, সৈয়দ আলী, আবেদ আলী, হারেজ, নাজেব, ওফাজ মোল্লা, বলি মোল্লা, ইয়ার, নয়ন মোল্লা প্রমুখ।

​হা-ডু-ডু খেলা: তেরশ্রী জনপদের বিভিন্ন স্থানে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ, পূজা-পার্বণ, নববর্ষকে কেন্দ্র করে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কোন উপলক্ষ ছাড়াও অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের আনন্দ-বিনোদনের ছাড়াও হা-ডু-ডু খেলা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

​হা-ডু-ডু খেলায় দুটি দল থাকে। প্রত্যেক দলে ৭ জন খেলোয়াড় থাকে। একপক্ষের খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে ডাক দেয়। কেউ বলে হা-ডু-ডু বা হা-টিক-টিক দম বন্ধ করে ডাক দিতে হয়। ডাক দিতে দিতে যদি এই খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের একজনকে স্পর্শ করে নিজের কোর্টে সে দাঁড়াতে পারেন তাহলে তার দল এক পয়েন্ট পাবেন। আর যদি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় দু’জনে ডাক দেওয়া খেলোয়াড়কে ধরে রাখতে পারে তাহলে তারা এক পয়েন্ট পাবে। এভাবে খেলা চলতে থাকে। একঘন্টা বা দুইঘন্টা সময় নির্দিষ্ট থাকে। মাঝখানে বিরতির জন্য দশ মিনিট থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোনো পক্ষের খেলোয়াড় অন্য পক্ষের খেলোয়াড়কে বেশি সংখ্যায় ছুঁতে আসতে পারে, তবে তারা জয়ী হবে। তেরশ্রী জনপদের কয়েকজন হা-ডু-ডু খেলোয়াড়ের নাম: পান্নু প্রধান, মোঃ তাহেজ উদ্দিন, রেজ্জাক, মুকুল বেপারী, কেলে ব্রাক্ষ্মণ, আহমেদ আলী, খোকা, শুকুর আলী, আনছু, বকুল, কুদ্দুস।

লাঠি খেলা: আগের দিনের জমিদারগণ নিজেদের এলাকা, সীমানা, ভূ-সম্পত্তি ও প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখবার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী রাখতেন। জমিদারগণ আত্মরক্ষা অথবা কোন সংঘাত মোকাবেলা করার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী লালন করতেন। জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর অনুকরণেই মূলত লাঠি খেলা সৃষ্টি হয়েছে। লাঠি খেলার ওস্তাদকে সরদার বলে। এই জন্য এটি ‘সরদার বাড়ি’ খেলা নামেও পরিচিত।

আগেকার দিনে ঈদের দিনে, চৈত্রসংক্রান্তিতে, বিয়ে বাড়িতে অথবা যেকোনো সাপ্তাহিক উৎসবের মধ্যে লাঠি খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল। তাছাড়া অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি শখ করে লাঠি খেলার আয়োজন করতেন। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা বা সরদারবাড়ি খেলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

​লাঠি খেলায় বিশেষ নৃত্যের তালে তালে লাঠিয়াল দল ঘুরতে থাকে। কাঁসার কলসির উপর কাঁসার থালা বাজিয়ে অথবা কখনো ‘চাপ থালা’ বাজিয়ে নৃত্যের তাল রক্ষা করা হয়। নাচের যেমন বিভিন্ন প্রকার আছে, তেমনি আছে লাঠির ও বিভিন্ন প্রকার। লাঠি খেলার অন্যতম বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ডাক’। এটা লাঠি খেলার আকর্ষণীয় বিষয়। লাঠি খেলার ডাক হচ্ছে মূলত শক্তির উৎস। ডাক দেওয়ার বিভিন্ন প্রকার আছে। ডাক দেওয়ার আগে মন্ত্র পাঠ করা হয়। এই খেলায় অনেক তন্ত্র-মন্ত্র নিয়ে কাজ করতে হয়। লাঠি খেলায় কালী সাধন আছে। এই বিশেষ সাধন করলে শরীর গরম হয়। দেহে শক্তি উৎপন্ন হয়। তেরশ্রী গ্রামের তেরশ্রী বিজয় মেলার উদ্বোধনী দিনে এই খেলা এখনো প্রদর্শিত হয়ে থাকে। তেরশ্রী জনপদের কয়েকজন লাঠি খেলোয়াড়ের নাম: বলাই ঘরামি, লালচান, হাবিবুর রহমান, হোসেন আলী, চিকন আলী, ওমর আলী, নইদ্যা, ইব্রাহিম মুন্সী, তাহেজ উদ্দিন, বলি মোল্লা, তামজ, জিন্নাহ, আক্কাস, শুকুর আলী, কিয়ামউদ্দিন, তামেজ মিয়া, লক্কু মিয়া, গোলাম মিয়া, মুনাফ ব্যাপারী, আয়নার মিয়া, চান্দু মিয়া, আনোয়ার, মফেজ, নান্নু প্রমুখ।

​ফুটবল: ফুটবল একটি দলগত খেলা। এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় খেলা। এটি দুই দলের মধ্যে খেলা হয়। যার প্রতি দলে ১১ জন খেলোয়াড় থাকে। এটি বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রচলিত খেল। ফুটবলের বেশ কিছু ভালো টিম মানিকগঞ্জের বিভিন্ন মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্ট অংশগ্রহণ করে দৃষ্টি নন্দনীয় খেলা উপহার দিয়ে দর্শকদের আনন্দ উল্লাসে মাটিয়ে তুলতো।

রহল আমিন বাচ্চু বাংলাদেশ জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান অধিকারের পাশাপাশি ফুটবলেও তার সাফল্য কম নয়। দীর্ঘদিন মানিকগঞ্জে মহকুমা ফুটবল দলে খেলেছেন। এছাড়া B.R.T.C ও বাংলাদেশ ফুটবল টিমের খেলোয়াড় হিসাবে বিভিন্ন লিগ ও টুর্নামেন্টের সকল ফুটবলার ছিলেন তিনি।

আনজু প্রধান, দূর দূরান্তে গিয়েও খেলতেন। লাউহাটি মাঠে গিয়ে বিদেশীদের বিপক্ষে একবার পাঁচ গোল করেন। ৩৬ টি দলের মধ্যে সেরা হয়েছিলেন। রহল আমিন, কর্নেল আবুল, মীর জাহিদ, কালাম মাস্টার, লেবু ঠাকুর, মীরজাহান, বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজ, কুইন্ট্যা পাগলা, বাইলজুরীর সিকান্দার, পাঁচথবীর তারা মেম্বার, পাঁচথবীর সিদ্ধেশ্বর, মনজু প্রধান, লতা প্রধান, চাল্লু ভুঁইয়া, হাবু ভুঁইয়া, সুমঙ্গল ঠাকুর, রাবু ঠাকুর, সামিউল প্রধান, বাইলজুরীর রুবেল, তেরশ্রী অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলতেন।

স্মৃতি হাতরিয়ে আঞ্জু প্রধান বলেন, অন্য গ্রামের খেলোয়াড় ও তেরশ্রী দলের হয়ে খেলতে গর্ববোধ করতেন। যেমন সিংজুরির নিম্মু, ঘিওরার শিশির ঠাকুর, তেরশ্রী দলে খেলতেন। তেরশ্রীর খেলোয়াড়গণ বিভিন্ন গ্রামে হায়ারে গিয়ে খেলতেন। দূরদুরান্ত থেকে আমরা অনেক কাপ নিয়ে এসেছি। তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষকদের মধ্যে রাধানাতবাবু (প্রধান শিক্ষক), আব্দুল হাকিম মাস্টার, মন্তোষ পাল মাস্টার, আমির মাস্টার, হাবিবুর রহমান হবি মাস্টার শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন। তেরশ্রী খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন মীর জাহিদ, হাকিম মাস্টার, কালাম মাস্টার, তৈয়ব আলী মাস্টার। ফুটবল টিম গঠনে এরা অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। পরবর্তীতে হাবু ভুঁইয়া খেলাধুলায় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

​অনিল কর, মন্তোষ কুমার পাল, পরিতোষ কুমার পাল রেফারি দিতেন। পরবর্তীতে আব্দুস সালাম, জসীম উদ্দিন, ইন্দ্রজিৎ কর কালু, রঞ্জিত শীল, ফাকির আলী, স্বপনঞ্জন দাস সুবল, বারেক মোল্লা এরা রেফারি দিতেন। এইসব লোকজন খেলাধুলা নিয়েই থাকতেন। তাদের অন্য কোন নেশা ছিল না। তারা সবসময় সেরা হতে চাইতেন এবং এইসব নিয়েই চিন্তা করতেন। গ্রামের প্রতি ভালোবাসার টানে তাদের ক্লাবে সংযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা ক্লাবমুখী হননি। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে তেরশ্রী খেলাধুলায় বেশি উন্নত ছিল।

ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলা: ক্রিকেট খেলা যুবক শ্রেণি মাঠে এবং গ্রামের ছোট খাটো ফাঁকা মাঠে বা জায়গায় এ খেলার আয়োজন করে থাকে। বর্তমানে এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এছাড়া কানামাছি, দড়ি লাফানো, হাঁড়ি ভাঙা, লুকোচুরি, কুতকুত খেলা, ইর্চি-বির্চি, ডাংগুলি খেলা, ওপেনটি বায়োস্কোপ, ছি-ব্রুড়ি, ঘুড়ি উড়ানোর প্রভূতি খেলা দেখতে পাওয়া যায়। ঘুড়ি উড়ানো বাংলার একটি জনপ্রিয় খেলা। গ্রীকালের পরন্ত বিকেলে রাখালেরা বা স্কুল ফেরৎ ছেলেমেয়েরা এ খেলা খেলে থাকে। ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতাও হয়। বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন-মানুষ ঘুড়ি, প্লেন ঘুড়ি, মাছ ঘুড়ি, সাপু ঘুড়ি, চিল ঘুড়ি, টং ঘুড়ি, পাতলা ঘুড়ি, মটর ঘুড়ি, ঢোল ঘুড়ি, তারা ঘুড়ি, কইরা ঘুড়ি, পতঙ্গা ঘুড়ি ইত্যাদি।

​বর্তমান অবস্থা: নানাবিধ কারণে খেলাধুলার চর্চার ক্ষেত্র অনেকটা কমে গেছে। তেরশ্রী জনপদের উজ্জ্বল খেলাধুলার কথা আজ বিলুপ্ত স্মৃতি। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মানুষের জীবন ধারায় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের হাওয়ায় স্বভাবতই পরিবর্তন এসেছে খেলাধুলাতেও। ক্লাবগুলোর গতিহীনতা ও সঠিক নেতৃত্বের অভাব এবং অনেকংশই দায়ী। এক সময় তেরশ্রী জনপদে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে তেরশ্রী স্পোর্টিং ক্লাব, পয়লা সবুজ সংঘ, বাহাদুরপুর শাপলা স্পোর্টিং ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাব গড়ে উঠেছিল। ক্লাবগুলো এখন খেলাধুলার মধ্যে নেই।

খেলাধুলায় আবার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্লাবসহ সমাজের সকল স্তরে সবাইকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। তাহলেই যুব সমাজ তার জীবনের সঠিক লক্ষ্য খুঁজে পাবে। খেলাধুলায় প্রাণ ফিরে আসুক। প্রযুক্তি নির্ভর না হয়ে তরুণসহ আবালবৃদ্ধবনিতা সুস্থ বিনোদনে ফিরে আসুক এটাই প্রত্যাশা।

লেখক-

পিযুষ পাল

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নতুন দেশ ২৪

জেলা প্রতিনিধ,দৈনিক ঢাকার ডাক