০১:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দুর্গতরা

যমুনার গ্রাসে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর: বিলীন দেড় শতাধিক বসতভিটা, ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা চরাঞ্চল

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় যমুনা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত কয়েক দিনের টানা ও অব্যাহত নদীভাঙনে উপজেলার জিয়নপুর ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার তাদের বসতভিটা, আবাদি জমি ও শেষ সম্বল হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নদীপাড়ের আরও কয়েকশ পরিবার বর্তমানে চরম ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তেই যমুনার গ্রাসে চলে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা, যার ফলে স্থানীয়দের মাঝে চরম হাহাকার ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার জিয়নপুর ইউনিয়নের বড় লাউতারা ও ছনপাড়া গ্রামে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও বাঘুটিয়া ও চরকালিকাপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট ও অসংখ্য গাছপালা ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো মাথা গোঁজার মতো কোনো বিকল্প জায়গা না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে, বাঁধের ওপর কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই ভাঙন আতঙ্কে তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ভেঙে নিরাপদ দূরত্বের স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। চরাঞ্চলের এই আকস্মিক দুর্যোগে দুর্গত এলাকায় তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্র ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা নদী ব্যবস্থাপনার তোয়াক্কা না করে এই বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশ ফাঁপা হয়ে গেছে। এর ফলেই বর্ষা মৌসুমে পানির সামান্য চাপ বাড়তেই পাড় ধসে ভাঙন এমন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর শুধু সাময়িক আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই তীর সংরক্ষণ বাঁধ আজ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়নি।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভাঙনকবলিত চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকাতে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, জিও ব্যাগে এই তীব্র স্রোত ও ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়।

এই বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দৌলতপুর ও শিবালয় এলাকার নদী তীরবর্তী অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার একটি মেগা নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু হলে চরাঞ্চলের মানুষকে চিরতরে এই নদীভাঙনের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

হরিরামপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, ৪ জেলের ৭ দিনের কারাদণ্ড।

ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দুর্গতরা

যমুনার গ্রাসে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর: বিলীন দেড় শতাধিক বসতভিটা, ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা চরাঞ্চল

Update Time : ০৬:৪২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় যমুনা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত কয়েক দিনের টানা ও অব্যাহত নদীভাঙনে উপজেলার জিয়নপুর ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার তাদের বসতভিটা, আবাদি জমি ও শেষ সম্বল হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নদীপাড়ের আরও কয়েকশ পরিবার বর্তমানে চরম ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তেই যমুনার গ্রাসে চলে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা, যার ফলে স্থানীয়দের মাঝে চরম হাহাকার ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার জিয়নপুর ইউনিয়নের বড় লাউতারা ও ছনপাড়া গ্রামে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও বাঘুটিয়া ও চরকালিকাপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট ও অসংখ্য গাছপালা ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো মাথা গোঁজার মতো কোনো বিকল্প জায়গা না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে, বাঁধের ওপর কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই ভাঙন আতঙ্কে তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ভেঙে নিরাপদ দূরত্বের স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। চরাঞ্চলের এই আকস্মিক দুর্যোগে দুর্গত এলাকায় তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্র ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা নদী ব্যবস্থাপনার তোয়াক্কা না করে এই বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশ ফাঁপা হয়ে গেছে। এর ফলেই বর্ষা মৌসুমে পানির সামান্য চাপ বাড়তেই পাড় ধসে ভাঙন এমন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর শুধু সাময়িক আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই তীর সংরক্ষণ বাঁধ আজ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়নি।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভাঙনকবলিত চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকাতে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, জিও ব্যাগে এই তীব্র স্রোত ও ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়।

এই বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দৌলতপুর ও শিবালয় এলাকার নদী তীরবর্তী অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার একটি মেগা নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু হলে চরাঞ্চলের মানুষকে চিরতরে এই নদীভাঙনের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।