০৪:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়’ – বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।’

১৪ জুলাই (মঙ্গলবার) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে শেষ কর্মদিবসে দেওয়া বিদায়ী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় ।

এ উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমূখ ।

বিদায়ী বক্তবকালীন সময় বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর নিচ্ছেন। তবে এটিকে তিনি শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখেন।’তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ কেবল বিচারক বা আইনজীবীদের নয়; এটি সবার প্রতিষ্ঠান। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া গেলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে অবসর নেওয়া যায় না। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, ততদিন দেশের কল্যাণে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করবেন।’

নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সততা, এরপর চরিত্র এবং তারপর অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই নিয়মিত সংবিধান, আইন, দেশি-বিদেশি রায় ও বিচারতত্ত্ব অধ্যয়ন করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’

বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মামলার জট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও সেবামুখী করা এখন সময়ের দাবি। শুধু বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই হবে না, জনগণের কাছে তা দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা, আর সেই আস্থা রক্ষা করাই সর্বোচ্চ দায়িত্ব।’

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘বিচক্ষণভাবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াবে, মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করবে।’

জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা জয় করে নির্ভয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকার আহ্বান জানান। তার মতে, নতুন প্রজন্মের বিচারকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উৎকর্ষ আরও বৃদ্ধি পাবে।

বক্তব্যের শেষাংশে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; বরং বিচারবোধ, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থায় নিহিত।’ এসময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; তার আনুগত্য সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতি।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

হরিরামপুরে সুতালড়ী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দোয়া ও সমর্থন প্রার্থী- মোঃ হান্নান মোল্লা।

বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়’ – বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম।

Update Time : ০৭:৩২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।’

১৪ জুলাই (মঙ্গলবার) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে শেষ কর্মদিবসে দেওয়া বিদায়ী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় ।

এ উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমূখ ।

বিদায়ী বক্তবকালীন সময় বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর নিচ্ছেন। তবে এটিকে তিনি শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখেন।’তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ কেবল বিচারক বা আইনজীবীদের নয়; এটি সবার প্রতিষ্ঠান। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া গেলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে অবসর নেওয়া যায় না। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, ততদিন দেশের কল্যাণে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করবেন।’

নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সততা, এরপর চরিত্র এবং তারপর অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই নিয়মিত সংবিধান, আইন, দেশি-বিদেশি রায় ও বিচারতত্ত্ব অধ্যয়ন করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’

বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মামলার জট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও সেবামুখী করা এখন সময়ের দাবি। শুধু বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই হবে না, জনগণের কাছে তা দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা, আর সেই আস্থা রক্ষা করাই সর্বোচ্চ দায়িত্ব।’

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘বিচক্ষণভাবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াবে, মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করবে।’

জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা জয় করে নির্ভয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকার আহ্বান জানান। তার মতে, নতুন প্রজন্মের বিচারকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উৎকর্ষ আরও বৃদ্ধি পাবে।

বক্তব্যের শেষাংশে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; বরং বিচারবোধ, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থায় নিহিত।’ এসময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; তার আনুগত্য সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতি।’