বিজয়ের ঠিক ২৪ দিন আগে, ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর ভোররাতে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে চালানো হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম গণহত্যা। পাকিস্তানি হানাদার এবং তাদের দোসর আল-বদর ও রাজাকারদের যৌথ তাণ্ডবে সেদিন এই অঞ্চলের ৪৩ জন নিরীহ মুক্তিকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সেই ৪৩ জন শহীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি রাষ্ট্র। ফাইলবন্দি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সদিচ্ছার চরম অভাব আর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া ৭ জন শহীদ আজও রাষ্ট্রীয় খাতায় কেবলই “অজ্ঞাত সংখ্যা” হয়ে টিকে আছেন।
দীর্ঘ সময় পর স্থানীয় ও বেসরকারি উদ্যোগে ৩৬ জনের নাম কোনোমতে উদ্ধার ও শনাক্ত করা সম্ভব হলেও, বাকি ৭ জন শহীদের নাম-পরিচয় আজও অন্ধকারেই রয়ে গেছে। শনাক্তকৃত ৩৬ জনের মধ্যে তেরশ্রী এস্টেটের জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ সাধন কুমার সরকার, বিপ্লব কুমার সাহা, শচীন্দ্র নাথ গোস্বামী, মাখন চন্দ্র সরকার, শ্যামলাল সূত্রধর, রমজান আলী, মহেন্দ্র দাস, নিতাই চন্দ্র দাসের মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন, কিন্তু বাকি ৭ জনের কোনো খোঁজ রাষ্ট্র রাখেনি। প্রতি বছর ২২ নভেম্বর এলে তেরশ্রী ট্র্যাজেডি দিবসে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ফুল দেওয়ার হিড়িক পড়ে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার সেই একদিন পার হলেই ৪৩ জনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির ফাইলটি আবার ধুলোবালি মাখানো আলমারিতেই বন্দি হয়ে পড়ে থাকে। প্রশ্ন উঠেছে— যারা দেশের জন্য প্রাণ দিলেন, আজ এত বছর পরও তারা কেন রাষ্ট্রীয় খাতা-কলমে কেবলই সংখ্যার বেড়াজালে বন্দি থাকবেন এবং এর চেয়ে বড় ঐতিহাসিক ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ওই ভয়াল রাতে ঘাতকেরা শুধু তেরশ্রী গ্রাম নয়, বরং পার্শ্ববর্তী সেনপাড়া, বড়রিয়া এবং বড়বিলা গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের ওপরও একযোগে হামলা চালায়। তৎকালীন সময়ে প্রাণভয়ে অন্য অঞ্চল থেকে এসে তেরশ্রীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন অনেক হিন্দু শরণার্থী ও ভাসমান পরিবার, যাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর বহু পরিবার পরবর্তীতে ভারতে কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে স্থানান্তরিত হন। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, স্বাধীনতার পর সরকারি কোনো বিভাগ বা সংস্থাই মাঠপর্যায়ে গিয়ে এই পরিবারগুলোর খোঁজ নেওয়ার বা একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি এবং নিখোঁজ শহীদদের নথিপত্র। আজ যখন প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বেঁচে নেই, তখন এই তালিকা সম্পন্ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে— যার সম্পূর্ণ দায়ভার কোনোভাবেই প্রশাসন এড়াতে পারে না।
১৯৯৪ এবং পরবর্তীতে ২০১২ সালে এলজিইডি (LGED)-এর অধীনে তেরশ্রীতে শহীদদের স্মরণে চমৎকার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও পাথরের সেই ফলক যেন আজ প্রশাসনকে উপহাস করছে। পাথরের গায়ে যে ক’টি নাম খোদাই করা আছে, তার বাইরে বাকিদের পরিচয় উদ্ধারে কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা জাতীয় গবেষণা দল কেন গঠন করা হলো না, সেই জবাব আজ পর্যন্ত মেলেনি। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও ৪৩ জন শহীদের সবার নাম রাষ্ট্রীয় তালিকায় স্থান না পাওয়ায় স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারগুলোর মনে জমেছে তীব্র ক্ষোভ ও আক্ষেপ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রতি বছর শুধু আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে একদিনের জন্য শহীদদের স্মরণ করার এই ‘ভণ্ডামি’ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। এখন সময় এসেছে একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে হলেও তেরশ্রী গণহত্যার প্রতিটি শহীদের নাম ও পরিচয় উদ্ধার করে গেজেটভুক্ত করার, তা না হলে তেরশ্রীর মাটি ও ইতিহাস কোনোদিনই বর্তমান প্রজন্মকে ক্ষমা করবে না।
পিযুষ পাল, স্টাফ রিপোর্টার 















