একটি সমাজের প্রকৃত মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজ কখনো পূর্ণতা পায় না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী, নীতিবান ও পরোপকারী করে তোলে। শিক্ষার আলো যখন একজন মানুষের অন্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করে, তখন তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রকৃত সাদামনের মানুষ। এমন আদর্শ মানুষদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং সরলতাহই সমাজকে সবসময় সঠিক পথ দেখায়।
আজকের দিনে আমরা অনেকেই শিক্ষাকে কেবল ক্যারিয়ার গড়ার বা অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখি। কিন্তু শিক্ষার মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের চরিত্র গঠন করা। একজন মানুষ গণিত, বিজ্ঞান বা সাহিত্যে অনেক বড় পণ্ডিত হতে পারেন, কিন্তু তার মধ্যে যদি মানবিকতা, সততা এবং মানুষের প্রতি সাধারণ ভালোবাসা না থাকে, তবে সেই শিক্ষার সামাজিক মূল্য অনেকখানি কমে যায়। প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কখনো নিজের জ্ঞান বা পদবি নিয়ে অহংকার করেন না, বরং তার অর্জিত জ্ঞানকে খুব সহজভাবে বিলিয়ে দেন সমাজের কল্যাণে।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু অনন্য পদ্ধতি মেধার ভিত্তিকে দারুণভাবে শক্ত করেছিল। যেমন একসময় উপমহাদেশে যাদব বাবুর পাটিগণিত ছিল গণিতচর্চার মূল চাবিকাঠি। এই কঠিন ও জটিল গণিত যারা নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করতেন, তাদের বুদ্ধিমত্তা, লজিক ও ধৈর্য হতো অসাধারণ। একজন মানুষ যখন এই গণিতের গভীরতা আর সরল জীবনযাপনকে একসাথে মেলাতে পারেন, তখন তিনি সমাজে অনন্য হয়ে ওঠেন।
বিশেষ করে, গণিত শিক্ষার প্রসারে এই গুণী মানুষের অবদান ছিল অতুলনীয়। গণিতের মতো একটি জটিল ও ভীতিজাগানিয়া বিষয়কে তিনি যেভাবে সহজ, প্রাঞ্জল এবং রসবোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতেন, তা সত্যিই বিরল। জ্যামিতির নিখুঁত উপপাদ্য থেকে শুরু করে পাটিগণিতের জটিল হিসাব-নিকাশ —সবকিছুই তাঁর জাদুকরী উপস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠত। তিনি কেবল গাণিতিক সূত্র মুখস্থ করাতেন না, বরং অঙ্কের পেছনের লজিক ও যুক্তিকে মনের ভেতর গেঁথে দিতেন, যা শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। শত শত শিক্ষার্থীর গণিতভীতি দূর করে তাদের মনে লজিক্যাল থিংকিং বা যৌক্তিক চিন্তার বীজ বুনে দেওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান।
তিনি শুধু গণিতের শিক্ষক ছিলেন না – সাহিত্যের উপর উনার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। ইংরেজি, ভূগোল,বিজ্ঞান এসব বিষয়ও তিনি স্কুলে পড়াতেন। সব বিষয়ে পারদর্শিতার কারণে তাকে “all square” বলতো তাঁর ছাত্ররা।
শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি ছাত্রছাত্রীদের সবসময় বলতেন, হাজার মিথ্যা কথা বললেও একটা মিথ্যাও বলা বা বানানো চলবে না। কাগজের একটি ছোট মিথ্যা কথা একদিন অনেক বড় আকার ধারণ করতে পারে। তিনি কঠোর সত্যবাদিতা মেনে চলতেন; তিনি জীবনে কখনো মিথ্যা কথা বলতেন না এবং মিথ্যা বলা বা নেওয়া ছিল তাঁর পরম বিরোধী।
এই গুণী ও বিদগ্ধ মানুষটির জন্ম ১৯১৭ সালের ২৯ আগস্ট, মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী ইউনিয়নের ধানগৌরী বড়বাড়ির (সিংহ বাড়ি) এক ধ্রুপদী ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর শ্রদ্ধেয় বাবা ছিলেন হারান চন্দ্র সিংহ এবং মা কুমুদিনী সিংহ। বাবা হারান চন্দ্র সিংহ একাধারে সুদর্শন, সুপুরুষ এবং ধানগৌরী এলাকার নামী ও ধনী ব্যক্তি ছিলেন। এলাকার মানুষ যেমন তাঁকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি সমীহ ও ভয়ও করতেন; পাশাপাশি তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু মনের মানুষ। তিনি ছয় বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন।
জিতেন্দ্র কুমার সিংহের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলেই। তাঁর বাবা হারান চন্দ্র সিংহ তাঁদের বাড়ির সামনে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মূলত তাঁর পড়াশোনার জন্যই এই বিদ্যালয়টি গড়ে তোলা হয়েছিল। এই স্কুলেই তিনি তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি নেন এবং পরবর্তীতে এলাকার সব ছেলেমেয়েরাও এই স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। এই বিদ্যালয়ের একজন গুণী শিক্ষক ছিলেন বড় কুষ্টিয়ার কৃতিসন্তান বিজয় সরকার। পরবর্তীতে তাঁর কলেজ জীবন কেটেছে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। বিএসসি পড়ার জন্য তিনি কলকাতায় গমন করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর পিতার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
তাঁর কর্মজীবন ছিল এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল মান্দাত্বা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর তিনি তেরশ্রী কালী নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় এবং অতঃপর ঘিওর দুর্গা নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পুনরায় তেরশ্রী কালী নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ঘিওর থানায় শিক্ষকতা করার সময় তিনি তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য একবার ‘বেস্ট টিচার’ হিসেবে পুরস্কৃত হন। পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ জেলা থেকেও তাঁকে ‘বেস্ট টিচার’-এর পুরস্কারের জন্য ডাকা হয়েছিল, কিন্তু অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ও নিরহংকার এই মানুষটি আর সেখানে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।
কর্মজীবনে যেমন তিনি ছিলেন এক প্রখ্যাত পণ্ডিত, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন এক অনন্য সাদামনের মানুষ। তাঁর সহধর্মিণী সুজাতা রানী সিংহও ছিলেন একজন বিদুষী নারী। তিনি প্রদীপের আলোয় বা গভীর রাতে জেগে তাঁর বড় ভাইয়ের কাছে পড়াশোনা করতেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সন্তানদের হাতের সুন্দর লেখা ও ইংরেজি ‘Cursive Handwriting’ শেখানোর পেছনে একমাত্র কারিগর ছিলেন এই বিদুষী মা। তিনি ০৩ পুত্র ও ০৯ কন্যা সন্তানের জনক।
তিনি নিজে ছিলেন এক অসম্ভব পড়াশোনাপ্রিয় মানুষ। গভীর রাতে পড়ালেখার এক অনন্য অভ্যাস ছিল তাঁর; রাতে শোওয়ার পরে রাত ৮:০০ থেকে ১০:০০ পর্যন্ত এবং আবার রাতের শেষভাগে (যেমন রাত ৩:০০ বা ৪:০০ টার দিকে) ঘুম থেকে উঠে তিনি একা একা পড়াশোনা করতেন ও গান শুনতেন। তাঁর জীবনে ছিল গান ও পড়াশোনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি গান শুনতে ভালোবাসতেন এবং মাঝেমধ্যে সুর করে গানও গাইতেন। গণিতের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও সঙ্গীতের প্রতি তাঁর এক গভীর টান ও অনুরাগ ছিল। বিভিন্ন গান তিনি নিজের মতো করে খাতায় পরম যত্নে লিখে রাখতেন।
অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি নিজে কখনো কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করা পছন্দ করতেন না। তবে কেউ গায়ে হাত তুললে বা কোনো অন্যায় করলে তিনি কঠোরভাবে তার প্রতিবাদ করতেন।
আজকের এই জটিল পৃথিবীতে সত্যিকারের সাদামনের মানুষ পাওয়া সত্যিই দুর্লভ। সাদামনের মানুষ বলতে আমরা তাদের বুঝি, যাদের মনে কোনো লোকদেখানো অহংকার নেই, যারা নীরবে-নিভৃতে মানুষের উপকার করে যান। তিনি ছিলেন এক অনন্য অহংকারহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী; প্রখ্যাত পণ্ডিত ও শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন এবং তাঁর কাছে সাহায্য বা প্রয়োজনে আসা কাউকেই কখনো খালি হাতে ফেরাতেন না। একজন প্রখ্যাত গণিতবিদ বা শিক্ষক যখন তাঁর সমস্ত প্রজ্ঞা নিয়ে একদম সাধারণ জীবনযাপন করেন, তখন তিনি সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় পরিণত হন। তাদের চলে যাওয়ার পরও সমাজ তাদের আজীবন শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করে।
এই গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আজ আমরা স্মরণ করছি শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করা এক অনন্য আলোকবর্তিকাকে— যিনি নিজের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে শত শত শিক্ষার্থীর মনে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছেন। বিশেষ করে কঠিন গণিত ও পাটিগণিতের মতো বিষয়কে যিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছিলেন, তাঁর সেই অবদান চিরস্মরণীয়।
অহংকারহীন, সরল এবং সদালাপী এই ব্যক্তিত্বের জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও সমাজের জন্য তিল তিল করে কাজ করে যাওয়া যায়।
২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এই মহান ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন। তাঁর এই আদর্শ, শিক্ষা ও মানবিক গুণাবলী আগামী প্রজন্মের জন্য সবসময় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। শিক্ষা ও ভালো মানুষের এই মেলবন্ধনই আসলে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলে।
আমরা এই গুণী ও আদর্শ মানুষের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁর রেখে যাওয়া সমস্ত মেধা, আদর্শ ও সরলতার প্রতি জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রশংসাপত্র।
লেখা ও গবেষনায় –
পিযুষ পাল,স্টাফ রিপোর্টার দৈনিক নতুন দেশ ২৪,জেলা প্রতিনিধি,দৈনিক ঢাকার ডাক।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা –
সুতপা সিংহ ( জিতেন্দ্র সিংহের কন্যা)
© কপিরাইট এবং সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত – ২০২৬
এই নিবন্ধ ও লেখার সম্পূর্ণ কপিরাইট এবং স্বত্ব স্বয়ং লেখক পিযুষ পাল-এর নিকট সংরক্ষিত। লেখকের পূর্বানুমতি ছাড়া এই লেখার কোনো অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কপির মাধ্যমে প্রকাশ, রি-পোস্ট বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রকাশের তথ্য: এই লেখা ২৫ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি হতে প্রথম প্রকাশিত হয়।
ফেসবুক লিংক-
পিযুষ পাল, স্টাফ রিপোর্টার 















