মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক স্কুলছাত্র সোহান মিয়া হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার দুপুরে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস কে এম তোফায়েল হাসান জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালত কক্ষে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দা মো. আওয়াবিন মিয়া এবং বরিশালের বাসিন্দা মো. সাগর মুন্সি। রায় ঘোষণার সময় আসামি আওয়াবিনকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আদালতে হাজির করা হলেও অপর আসামি সাগর মুন্সি শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। আদালত মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দুই আসামির প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন, যা অনাদায়ে তাদের আরও ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে এই হত্যাকাণ্ডের যে নৃশংস বিবরণ জানা যায় তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ২০২১ সালে করোনা মহামারীর সময়ে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ ছিল, তখন সিংগাইর উপজেলার ফোর্ডনগর বিআরটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মেধারী ছাত্র সোহান মিয়া ঘরে বসে থাকেনি। দরিদ্র বাবা-মায়ের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে এবং পরিবারের হাল ধরতে সে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত হ্যালোবাইক চালানো শুরু করে। ২০২১ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে সে প্রতিদিনের মতোই উপার্জনের উদ্দেশ্যে নিজের ইজিবাইকটি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু গভীর রাত হয়ে গেলেও সে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের লোকজন সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের পরদিন অর্থাৎ ২০ জুলাই সকালে সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের খাসের চর এলাকার একটি নির্জন ধানি জমিতে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি নিখোঁজ সোহানের মরদেহ বলে শনাক্ত করেন।পুলিশের তদন্তে পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে যে এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল। ঘাতক চক্রটি মূলত সোহানের নতুন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক এবং তার হাতের দামি মোবাইল ফোনটি ছিনতাই করার জন্যই তাকে টার্গেট করেছিল। ঘটনার দিন বিকেলে আসামিরা যাত্রী বেশে সোহানের ইজিবাইকটি ভাড়া করে এবং বিভিন্ন রাস্তা ঘুরিয়ে সুকৌশলে তাকে ধল্লা ইউনিয়নের খাসের চরের নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে চারপাশের পরিবেশ ফাঁকা দেখার পর তারা সোহানের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সোহান তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ইজিবাইকটি বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা ও প্রতিরোধ গড়ে তুললে ঘাতকরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাকে মাটিতে চেপে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর তারা মরদেহটি ধানি জমিতে ফেলে রেখে ইজিবাইক ও মোবাইল ফোনটি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরদিন অর্থাৎ ২০ জুলাই ২০২১ তারিখে নিহত সোহানের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকটি উদ্ধার করে। তদন্ত কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ চার্জশিট দাখিল করেন। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আ ফ ম নূরতাজ আলম বাহার। তিনি জানান, বিচারক মোট ১৯ জন সাক্ষীর দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি-তর্ক শোনেন। সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক আজ সমাজকে অপরাধমুক্ত করার বার্তা দিয়ে এই সর্বোচ্চ সাজার রায় প্রদান করেন।রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত সোহানের মা ও তার স্বজনরা। তারা আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে দীর্ঘ ৫ বছর পর হলেও তারা আজ ন্যায়বিচার পেয়েছেন এবং তাদের সন্তান হত্যার বিচার হয়েছে। তবে তাদের দাবি, মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বাস্তবায়নের জন্য পলাতক আসামি সাগর মুন্সিকে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুই আসামির ফাঁসি যেন অবিলম্বে কার্যকর করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি করার সাহস কোনো অপরাধী না পায়।
পিযুষ পাল,স্টাফ রিপোর্টার। 














