মানিকগঞ্জ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য উর্বর জনপদ ঘিওর উপজেলা, যার বুকে বয়ে চলা ধলেশ্বরী ও চন্দনা নদীর পলিমাটিতে মিশে আছে শত বছরের লোকজ সংস্কৃতি। এই ঘিওরের ১নং পয়লা ইউনিয়নের নদীবিধৌত বাঙ্গালা গ্রামটিতে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এক সম্ভ্রান্ত, ভূস্বামী এবং অতি ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন ইতিহাসের এক অনন্য মহানায়ক, যাঁর নাম ডাঃ আব্দুল গণি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কিংবা নথিপত্রের কঠিন অক্ষরে নয়, এই অঞ্চলের হাজারো মেহনতি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি পরম মায়া ও শ্রদ্ধায় বেঁচে আছেন ‘গণি মিয়া’ নামে।
গণি মিয়ার বাবার নাম মৃতঃ ফুলচান তালুকদার এবং মাতার নাম গুলবাহার। তাঁর দাদার নাম (পিতামহ) মৃত কাঞ্চন তালুকদার, গণি মিয়া ভাইদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন,তার ছোট ভাই যথাক্রমে মোঃরহিজ উদ্দিন তালুকদার (দলিল লেখক), মোঃ জহির উদ্দিন তালুকদার (মোক্তার), সবার ছোট তোফাজ্জেল তালুকদার (ডাক্তার)
তৎকালীন সময়ে এই চরাঞ্চলটি ভৌগোলিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও অবহেলিত। বর্ষায় অথৈ জল আর শুকিয়ে গেলে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর পাড়ি দিয়ে মানুষকে চলতে হতো। শিক্ষা, আধুনিক চিকিৎসা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত এই জনপদের মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল কৃষি। নদী ভাঙন, বন্যা আর মহামারির সাথে লড়াই করা গ্রামীণ সাধারণ মানুষের এই সহজ-সরল জীবনযাত্রা এবং প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছিলেন তরুণ আব্দুল গণি।
পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে পাওয়া পরোপকারী মানসিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সুদৃঢ় মানবিক মূল্যবোধ তাঁকে ছাত্রাবস্থা থেকেই সমাজ সংস্কারের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নিজের সুখ-স্বاচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কীভাবে পরার্থে জীবন বিলিয়ে দেওয়া যায়, সেই দীক্ষাই ছিল তাঁর প্রারম্ভিক জীবনের মূল দর্শন, যা তাঁকে আজীবন এক খাঁটি সাদা মনের মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
রাজনীতি বা জনপ্রতিনিধিত্বের অনেক পূর্বে আব্দুল গণির মূল পরিচিতি ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ গ্রামীণ চিকিৎসক হিসেবে। তিনি তৎকালীন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এলএমএফ (LMF) কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করেন এবং নিজ ইউনিয়ন ও আশেপাশের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা শুরু করেন এবং সাধারন মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি চাকুরি বাদ দেন, তার এই জনসেবার কারনে নামের শুরুতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় ‘ডাঃ’ উপাধি। সে যুগে আধুনিক চিকিৎসা তো দূরের কথা, কোনো এমবিবিএস ডাক্তার বা ওষুধের দোকানও খুঁজে পাওয়া যেত না। ওলাউঠা (কলেরা), বসন্ত কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী মহামারি যখন একের পর এক গ্রামে হানা দিত, মানুষ যখন ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে নিজের আপনজনের লাশ ফেলে পালিয়ে যেত, তখন ডাঃ গণি মিয়া ছিলেন একমাত্র ত্রাণকর্তা। হাতে ওষধের ব্যাগ, স্টেথোস্কোপ আর অন্য হাতে একটি পুরোনো লণ্ঠন নিয়ে তিনি পায়ে হেঁটে বা নৌকায় চড়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতেন। গভীর রাতে প্রসূতি মায়েদের জটিলতা কিংবা শিশুদের তীব্র অসুখে তিনি টাকার দিকে তাকাতেন না। অনেক সময় দরিদ্র রোগীদের ঔষধ কেনার সামর্থ্য থাকত না; গণি মিয়া নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ঔষধ কিনে রোগীর পথ্যের ব্যবস্থা করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ডাক্তারের মিষ্টি কথা আর একটু আশ্বাসের বাণী রোগীর অর্ধেক রোগ ভালো করে দেয়, বাকি অর্ধেক কাজ করে ঔষধ। এই স্বর্গীয় মানবিক সেবার ফলেই তিনি পয়লা ইউনিয়নের প্রতিটি পরিবারের একজন পরম আত্মীয়ে পরিণত হন।
আব্দুল গণি সাহেবের জীবনের এই মহত্তম মানবিক যাত্রার এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বাঁকে যুক্ত হন এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মুসলিম পরিবারের কন্যা সাহেরা বানু। সাহেরা বানু ছিলেন একাধারে অসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং মমতার এক জীবন্ত প্রতীক। ডাঃ আব্দুল গণি যখন গভীর রাতে লণ্ঠন হাতে রোগীর চিকিৎসায় ঘরের বাইরে থাকতেন কিংবা দিনের পর দিন ইউনিয়নের জটিল সালিশ-বিচারে মগ্ন থাকতেন, তখন সাহেরা বানু একহাতে পুরো সংসার এবং সন্তানদের আগলে রাখতেন।
গণি মিয়ার বাড়িটি ছিল পয়লা ইউনিয়নের মানুষের জন্য একটি অঘোষিত আশ্রয়স্থল। দিন কিংবা রাত, যেকোনো সময়ে আসা শত শত অতিথি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থী এবং অসহায় মানুষদের আতিথেয়তার সিংহভাগ দায়িত্ব নিজ কাঁধে হাসিমুখে সামলাতেন সাহেরা বানু। তিনি কেবল একজন সাধারণ গৃহিণী ছিলেন না, বরং ছিলেন গণি মিয়ার নিঃশব্দ সামাজিক ও পারিবারিক উপদেষ্টা। তিনি স্বামীর সুরক্ষায় লণ্ঠনের তেল বা প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড ও ওষধের ব্যাগ নিজে গুছিয়ে দিতেন। গ্রামের অবহেলিত ও নিপীড়িত নারীদের সুখ-দুঃখের কথা তিনি শুনতেন এবং নারীদের অধিকার ও পারিবারিক সুরক্ষার বিষয়ে গণি মিয়াকে সামাজিক সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর সবচেয়ে বড় দূরদর্শিতা প্রকাশ পায় এই অঞ্চলের নারী শিক্ষার প্রসারের আকুলতায়, যা পরবর্তীতে এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছিল।
জনগণের প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই ডাঃ আব্দুল গণিকে গ্রামীণ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। তিনি ব্রিটিশ আমলের ইউনিয়ন বোর্ড, পাকিস্তান আমলের মৌলিক গণতন্ত্র (Basic Democracy) এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ—এই তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক জমানার রাজসাক্ষী ছিলেন। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি টানা এবং বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ৩৬ বছর ১নং পয়লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের ঠিক পরপর, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি পয়লা ইউনিয়ন বোর্ডের একজন অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা ও সমাজ নিয়ন্ত্রক ছিলেন। সে সময় অঞ্চলে উদ্ভূত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেন। সমাজকে দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিনি ঘিওর থানায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যা সে আমলের আঞ্চলিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও রাজনৈতিক দলিল হিসেবে গণ্য হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে যখন স্বাধীন বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নতুনভাবে গঠিত হয়, তখন সর্বস্তরের মানুষের অনুরোধে তিনি আবারও নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে থেকে যুদ্ধোত্তর পয়লা ইউনিয়নের পুনর্গঠন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং চরাঞ্চলের মানুষের পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগ করেন।
দীর্ঘ ৩৬ বছর চেয়ারম্যান থাকার মূল রহস্য ছিল তাঁর নিখুঁত ও সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন বিচার ব্যবস্থা। বাঙ্গালা গ্রামে তাঁর বাড়ির বৈঠকখানা জনসাধারণের জন্য দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকত। তিনি বলতেন, ঘরের কথা বাইরে নিয়ে কোর্ট-কাছারিতে টাকা এবং সম্মান নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। জমিজমা সংক্রান্ত জটিল বিরোধ, বংশীয় দাঙ্গা বা পারিবারিক কলহ তিনি দুই পক্ষকে সামনাসামনি বসিয়ে, চা-মুড়ি খাইয়ে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রজ্ঞা দিয়ে এমনভাবে মীমাংসা করে দিতেন যে কোনো পক্ষই অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরত না। তাঁর দেওয়া রায়কে সবাই আদালতের রায়ের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিত। ধবধবে সাদা সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে সুতি চাদর আর রোদ-বৃষ্টিতে মাথায় দেওয়া সেই বিখ্যাত কালো ছাতাটি ছিল তাঁর চেয়ারম্যানি জীবনের চিরচেনা অবয়ব, যা দেখলে অন্যায্য মানুষও নিমেষে মাথা নিছু করত। এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি ছিলেন এক খাঁটি সাদা মনের মানুষ। লোভ-লালসা বা অর্থ-সম্পদের মোহ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি নিজের জন্য কোনো বিলাসবহুল অট্টালিকা বা অবৈধ সম্পত্তি গড়ে যাননি। তাঁর একমাত্র স্থায়ী সঞ্চয় ছিল মানুষের অকৃত্রিম দোয়া আর ভালোবাসা।
ডাঃ আব্দুল গণি চেয়ারম্যান ছিলেন এ অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর পুরো রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষকে পরম মমতায় সমান চোখে দেখতেন। পয়লা ইউনিয়নে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী দোল পূর্ণিমা উৎসব ও দোল যাত্রা যখন আসত, তিনি মুসলিম সমাজকে সাথে নিয়ে মেলা ও মন্দির প্রাঙ্গণে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর, সম্প্রীতিময় ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, উৎসব যার যার, কিন্তু আনন্দ সবার। এই দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালা গ্রামে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান কারিগর ছিলেন এই দূরদর্শী জননেতা। বাঙ্গালা গ্রামের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী দোল পূর্ণিমার ‘জামাই মেলা’ (যা স্থানীয়ভাবে মাছের মেলা বা বউ মেলা নামে পরিচিত) ডাঃ আব্দুল গণি চেয়ারম্যানের হাত ধরেই এক ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও সর্বজনীন রূপ পায়। মেলাটি যখন প্রাচীন তেরশ্রী জমিদারদের হাত থেকে স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণে আসে, তখন মেলা থেকে বিপুল খাজনা আদায়ের একটি বাণিজ্যিক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। গণি মিয়া চেয়ারম্যান হিসেবে এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি দূর-দূরান্ত থেকে আসা কুটির শিল্পী, কামার-কুমার, মাটির খেলনা ও মিষ্টি বিক্রেতাদের ওপর থেকে সব ধরনের খাজনা বা ইজারা মওকুফ করে দেন। তাঁর এই একটি মানবিক সিদ্ধান্ত মেলাটিকে সম্পূর্ণ অলাভজনক কিন্তু লোকজ সংস্কৃতির এক অবিনশ্বর অংশ হিসেবে আজও অটুট রেখেছে। মেলা শেষে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হিন্দু-মুসলিম সকল জামাতাদের নিরাপত্তা ও আপ্যায়নের পুরো তদারকি তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করতেন এবং তাঁর স্ত্রী সাহেরা বানু বাড়ি আগলে জামাইদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন।
চেয়ারম্যান থাকাকালীন ১৯৭৩ সালে ডাঃ আব্দুল গণি গভীরভাবে অনুধাবন করেন যে, কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটি অবহেলিত সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন করতে পারবে না, যদি না মানুষের মনে শিক্ষার আলো পৌঁছায়। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে কাদা-জল পেরিয়ে দূরে যেতে হতো, যার কারণে বিশেষ করে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার পরেই পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত।
একদিন তাঁর সহধর্মিণী সাহেরা বানু অত্যন্ত আকুল হয়ে তাঁকে বলেন, আপনি তো পুরো ইউনিয়নের মানুষের জন্য এত কিছু করেন, কিন্তু আমাদের ঘরের মেয়েদের শিক্ষার কী হবে? ওরা যেন ঘরের কাছেই ভালো শিক্ষা পায়, সেই ব্যবস্থা করুন। স্ত্রীর এই দূরদর্শী আকুলতা এবং নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে ১৯৭৩ সালে তিনি নিজ গ্রামে একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত উদ্যোগ নেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিজের পৈতৃক ও পারিবারিক সম্পত্তি থেকে প্রায় ১২৮ শতাংশ জমি সম্পূর্ণ নিঃশর্তভাবে বিদ্যালয়ের নামে দান করেন। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ জমির উপর বিশাল খেলার মাঠ এবং বাকি অংশে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৭০-এর দশকের রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি এক কালজয়ী সিদ্ধান্ত নেন। বিদ্যালয়ের নামকরণে তিনি কেবল নিজের নাম ব্যবহার না করে, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, সহধর্মিণী সাহেরা বানু-এর নাম যুক্ত করে নাম রাখেন “বাঙ্গালা ডাঃ গণি-সাহেরা উচ্চবিদ্যালয়”। এটি ছিল নারীর প্রতি তাঁর গভীর সম্মান, দাম্পত্য ভালোবাসার এক অতুলনীয় স্মারক এবং নারী শিক্ষার প্রসারে এক ঐতিহাসিক সামাজিক বিপ্লব। বর্তমান প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র সরকারের অধীনে এই স্কুলটি আজও ঘিওরের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে।
১৯৭৬ সালের পর ডাঃ আব্দুল গণি সক্রিয় গ্রামীণ রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে অবসর নেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একজন পরম পরোপকারী সাদা মনের মানুষ হিসেবে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যান।
এই মহৎ দম্পতির ০৭ জন সন্তানই পিতামাতার সততা, বিনয় ও শিক্ষার আদর্শকে ধারণ করে দেশ ও বিদেশে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর বড় ছেলে এ জেড এম আব্দুর রাজ্জাক, যিনি ফ্যামেলি প্ল্যানিং এর ডিরেক্টর এ্যাডমিন হিসেবে অবসর গ্রহন করেন, তার ২য় পুত্র একে কে এম আব্দুর রফিক মানুষগড়ার কারিগর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন ( প্রধান শিক্ষক,অবসর প্রাপ্ত ১।কাকনা উচ্চ বিদ্যালয়,২। খলসী উচ্চ বিদ্যালয়), তাঁর ৩য় পুত্র এটিএম আব্দুর রশিদ তালুকদার, যিনি পেশায় সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে সুনামের সাথে কাজ করেছেন।
তাঁদের ছোট পুত্র প্রফেসর ডাঃ এ এস এম এ রায়হান বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU)-এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় লিভার ও প্যানক্রিয়াস বিশেষজ্ঞ হিসেবে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে (ধানমন্ডি) নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন এবং এই বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন।
তাঁর সুযোগ্য পুত্র বধু সুলতানা নাসিরা খান বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন অত্যন্ত সফল সাবেক যুগ্মসচিব, যিনি বর্তমানে তাঁর শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির রেখে যাওয়া বাঙ্গালা ডাঃ গণি-সাহেরা উচ্চবিদ্যালয়ের নিয়মিত পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
গণি মিয়ার মেয়ে ০৩ জন, বড় মেয়ের নাম লুৎফুেন্নসা
মেজো মেয়ের নাম মোসাম্মৎ বুলবুলি আর ছোট মেয়ের নাম মোসাম্মৎ লায়লা।
ঘিওর নদী হতে যে খালটি পয়লা মোড় হয়ে বহমান তা গনি মিয়ার খাল হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
লেখকের সমাপনী ভাবনা-
একটি সমাজের প্রকৃত রূপকার তাঁরাই, যাঁরা নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে জীবন উৎসর্গ করেন। গণি মিয়া ছিলেন তেমনই একজন বিরল প্রাণের মানুষ। তিনি শুধু তৎকালীন সময়ে একজন সফল চেয়ারম্যান বা চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, তিনি মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে তাঁর সবচেয়ে বড় পুঁজি বানিয়েছিলেন।
নিজের ভিটেমাটি আর চারপাশের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনকে আলোকিত করার যে স্বপ্ন তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী সাহেরা বেগম দেখেছিলেন— ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গা ডাঃ গণি-সাহেরা উচ্চবিদ্যালয় আজ সেই স্বপ্নেরই এক জীবন্ত স্মারক। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষা ও মানবতার যে আলোকবর্তিকা তিনি জ্বেলে দিয়ে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জনপদের মানুষকে পথ দেখিয়ে চলেছে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভবে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, সততা এবং জনকল্যাণের অনুপম দৃষ্টান্ত মানিকগঞ্জের এই মাটিকে চিরকাল ঋণী করে রেখেছে। গণি মিয়ার এই মহৎ জীবন এবং তাঁর অবদান এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। লেখকের তরফ থেকে এই মহান কর্মবীর ও জনদরদী নেতার স্মৃতির প্রতি রইল অন্তহীন শ্রদ্ধা ও স্যালুট।
কপিরাইট সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিশ:
এই গুণীজন সিরিজের সম্পূর্ণ লেখা ও গবেষণা লেখক পিযুষ পাল-এর মেধা স্বত্ব, যা ২৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে তার ফেসবুক আইডি (Pijush Paul Tanoy) থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
ফেসবুক লিংক-
https://www.facebook.com/share/p/1BeMxWGG1J
লেখকের লিখিত অনুমতি ছাড়া এই লেখার কোনো অংশ বা তথ্য অন্য কোথাও প্রকাশ করা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন এবং এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লেখা ও গবেষণা –
পিযুষ পাল
স্টাফ রিপোর্টার,দৈনিক নতুন দেশ ২৪
মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি,দৈনিক ঢাকার ডাক
পিযুষ পাল, স্টাফ রিপোর্টার 
















