০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনি মারপ্যাঁচে দেড় যুগ: মানিকগঞ্জে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩ মেগা প্রকল্প

আইনি মারপ্যাঁচে দেড় যুগ: মানিকগঞ্জে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩ মেগা প্রকল্প, নাগরিক ভোগান্তি চরমে।

মানিকগঞ্জ উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল অংশ হিসেবে আদালতের মামলা আর আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকে গেছে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের মূল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ। বেসরকারি টেলিভিশনের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মানিকগঞ্জ শহরের এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও জনভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আধুনিক পৌর সুপার মার্কেট ভবন, ব্যস্ততম খালপাড় এলাকার সংযোগ সেতু এবং একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের বহুতল একাডেমিক ভবন। দীর্ঘদিন কাজ থমকে থাকায় একদিকে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চরম নাগরিক ভোগান্তি পোহাচ্ছেন জেলা শহরের লাখো বাসিন্দা।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আধুনিক পৌর সুপার মার্কেটটি এখন মরচে ধরা লোহার রড, ধসে পড়া ইটের স্তূপ আর আগাছায় ঘেরা এক ভুতুড়ে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে নকশাবহির্ভূত দোকান বরাদ্দ ও অনিয়মের অভিযোগে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই মেগা অবকাঠামোটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আইনি মারপ্যাঁচে মার্কেটটির স্থায়ী বরাদ্দ ও নির্মাণকাজ পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

শহরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত একমাত্র খালটির সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকীকরণ প্রজেক্টের অংশ হিসেবে এই সংযোগ সেতু বা ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের নকশাগত ত্রুটি ও ঠিকাদারি গাফিলতির কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দায়ের করা মামলায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসে। ফলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ব্রিজের পিলারগুলো অর্ধেক করা অবস্থায় আদালত কাজের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করায় প্রতিদিন ওই রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা ও অস্থায়ী সেতু দিয়ে পার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

একইভাবে শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের বহুতল একাডেমিক ভবনের কাজ শুরু হলেও জমি সংক্রান্ত বিরোধে তা আটকে যায়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বড় বরাদ্দ এলেও বিদ্যালয়ের নিজস্ব খাস জমি দাবি করে স্থানীয় একটি পক্ষ আদালতে মালিকানার মামলা ঠুকে দেয়। ফলে বিদ্যালয়ের জায়গায় আদালতের স্থিতাবস্থা জারি থাকায় গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনে ক্লাস করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দীর্ঘ এই সময়ে নির্মাণ সামগ্রীর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় এখন আকাশচুম্বী হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে রড-সিমেন্টের এই বিশাল কাঠামো বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকায় দিন দিন এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করে বিশেষ বিবেচনায় এই প্রকল্পগুলো চালু করা না হলে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ চিরতরে ভেস্তে যাবে।

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, আইনি জটিলতা ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণেই মূলত কাজগুলো আটকে আছে। তবে উচ্চ আদালতের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনি লড়াই চালানো হচ্ছে। জনস্বার্থ বিবেচনা করে দ্রুতই আইনি জট কেটে যাবে এবং প্রকল্পগুলোর কাজ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

তীব্র ভাঙনে দিশেহারা চরাঞ্চলের মানুষ-শেষ সম্বল ভিটামাটি হারিয়ে দিশেহারা শতাধিক পরিবার।

আইনি মারপ্যাঁচে দেড় যুগ: মানিকগঞ্জে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩ মেগা প্রকল্প

আইনি মারপ্যাঁচে দেড় যুগ: মানিকগঞ্জে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩ মেগা প্রকল্প, নাগরিক ভোগান্তি চরমে।

Update Time : ০৩:০৫:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মানিকগঞ্জ উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল অংশ হিসেবে আদালতের মামলা আর আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকে গেছে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের মূল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ। বেসরকারি টেলিভিশনের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মানিকগঞ্জ শহরের এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও জনভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আধুনিক পৌর সুপার মার্কেট ভবন, ব্যস্ততম খালপাড় এলাকার সংযোগ সেতু এবং একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের বহুতল একাডেমিক ভবন। দীর্ঘদিন কাজ থমকে থাকায় একদিকে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চরম নাগরিক ভোগান্তি পোহাচ্ছেন জেলা শহরের লাখো বাসিন্দা।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বাস টার্মিনাল সংলগ্ন আধুনিক পৌর সুপার মার্কেটটি এখন মরচে ধরা লোহার রড, ধসে পড়া ইটের স্তূপ আর আগাছায় ঘেরা এক ভুতুড়ে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে নকশাবহির্ভূত দোকান বরাদ্দ ও অনিয়মের অভিযোগে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই মেগা অবকাঠামোটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আইনি মারপ্যাঁচে মার্কেটটির স্থায়ী বরাদ্দ ও নির্মাণকাজ পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

শহরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত একমাত্র খালটির সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকীকরণ প্রজেক্টের অংশ হিসেবে এই সংযোগ সেতু বা ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের নকশাগত ত্রুটি ও ঠিকাদারি গাফিলতির কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দায়ের করা মামলায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসে। ফলে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ব্রিজের পিলারগুলো অর্ধেক করা অবস্থায় আদালত কাজের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করায় প্রতিদিন ওই রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা ও অস্থায়ী সেতু দিয়ে পার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

একইভাবে শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের বহুতল একাডেমিক ভবনের কাজ শুরু হলেও জমি সংক্রান্ত বিরোধে তা আটকে যায়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বড় বরাদ্দ এলেও বিদ্যালয়ের নিজস্ব খাস জমি দাবি করে স্থানীয় একটি পক্ষ আদালতে মালিকানার মামলা ঠুকে দেয়। ফলে বিদ্যালয়ের জায়গায় আদালতের স্থিতাবস্থা জারি থাকায় গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনে ক্লাস করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দীর্ঘ এই সময়ে নির্মাণ সামগ্রীর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় এখন আকাশচুম্বী হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে রড-সিমেন্টের এই বিশাল কাঠামো বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকায় দিন দিন এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করে বিশেষ বিবেচনায় এই প্রকল্পগুলো চালু করা না হলে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ চিরতরে ভেস্তে যাবে।

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, আইনি জটিলতা ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণেই মূলত কাজগুলো আটকে আছে। তবে উচ্চ আদালতের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনি লড়াই চালানো হচ্ছে। জনস্বার্থ বিবেচনা করে দ্রুতই আইনি জট কেটে যাবে এবং প্রকল্পগুলোর কাজ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।