০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রজাহিতৈষী জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ও একটি ঐতিহাসিক এস্টেটের মহাকাব্য

তেরশ্রীর আলোকবর্তিকা: জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-১]

প্রজাহিতৈষী জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ও একটি ঐতিহাসিক এস্টেটের মহাকাব্য নিয়ে আমাদের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন ‘মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ’। আজ থাকছে এর প্রথম পর্ব।

জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন মানিকগঞ্জের তেরশ্রী এস্টেটের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী, দূরদর্শী এবং শিক্ষানুরাগী জমিদার। উনিশ শতক ও বিশ শতকের শুরুর দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে অধিকাংশ জমিদার যখন সাধারণ প্রজাদের ওপর শোষণ ও অত্যাচার চালাতেন, তখন কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি প্রজাবৎসল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এলাকার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার জন্য দিঘি ও পুকুর খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি অর্থায়ন করতেন। এছাড়া দুঃস্থদের সহায়তায় তিনি নিয়মিত দান করতেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় জনকল্যাণমূলক কাজ ছিল নিজ এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানো।

তিনি ছিলেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী এস্টেটের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য জমিদার। তাঁর স্ত্রী ছিলেন চম্পকাসুন্দরী দেবী। এই দম্পতির ঘরেই তেরশ্রী ট্র্যাজেডির মহান শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের ধারাবাহিকতা ছিল নিম্নরূপ: রামরতন রায় চৌধুরী → নরনারায়ণ রায় চৌধুরী → হরনারায়ণ রায় চৌধুরী → কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী → শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী → সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী। ইতিহাসের কিছু সূত্রে তাঁকে গাজীপুরের ভাওয়ালের রাজা কালী নারায়ণের সমসাময়িক বা একই জমিদার বংশের উপ-শাখা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসের নথিপত্রে একই সময়ে (ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে) ঢাকার অদূরে গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটেও “রাজা কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী” নামে আরেকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। ভাওয়ালের কালী নারায়ণ ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি পান এবং ঢাকার নর্থব্রুক হলের সংবর্ধনাসহ ঢাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাবশালী ছিলেন। অন্যদিকে, মানিকগঞ্জের তেরশ্রীর কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী আঞ্চলিকভাবে শিক্ষা বিস্তার ও লোকজ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় বেশি মনোযোগী ছিলেন।

তৎকালীন অনগ্রসর মানিকগঞ্জ অঞ্চলে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য ব্রিটিশ আমলে ১৯২২ সালে তাঁর নামানুসারে ও তাঁর জমিদারির অর্থায়নে তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশন (Terosree K.N. Institution) প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ প্রশাসনের সিএস (Cadastral Survey) ও আরএস (Revision Survey) খতিয়ানে তেরশ্রী এস্টেটের যে আয়তন ও রাজস্ব আয়ের বিবরণ পাওয়া যায়, তা তৎকালীন মানিকগঞ্জ সাব-ডিভিশনে তাদের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির প্রমাণ দেয়। এই নথিগুলোতে অনেক সময় তাদের দান করা জমির পরিমাণ ও শর্তগুলো দলিলাকারে সংরক্ষিত আছে, যা আইনিভাবে ওই বিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মজবুত করেছিল। এই বিদ্যালয়টি মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে আজও শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি ১৯২২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন ব্রিটিশ শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম মেনে বিদ্যালয়ের নিজস্ব নামে বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি এবং নগদ এককালীন তহবিল দান করেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মানিকগঞ্জ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ ও কৃষক পরিবারের সন্তানেরা যেন নামমাত্র খরচে আধুনিক মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে। ১৯২২ সালে কালীনারায়ণ বাবুর স্মরণে তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী ঘিওর এলাকার এক বিশাল নিজস্ব জমির ওপর এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়ের মূল ভবন, খেলার মাঠ এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কয়েক একর জমি এই সম্পত্তি থেকে দান করা হয়। ১৯৪২ সালে মানিকগঞ্জ জেলার প্রথম কলেজ হিসেবে তেরশ্রী কলেজ তাঁদের দান করা জমিতে এবং নিজস্ব অর্থায়নে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে এটি মানিকগঞ্জ জেলা সদরে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান বিখ্যাত সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ নামে রূপ নেয়।

কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী শুধু তেরশ্রীতেই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী ঘিওর হাটের তৎকালীন বড় ব্যবসায়ীদের অনুরোধে এবং শিক্ষার প্রসারে আরেকটি বড় অবদান রেখেছিলেন। সেই সময়ে তেরশ্রী এস্টেট অত্র অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বাজার কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ঘিওর এবং তেরশ্রীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নদীপথে পণ্য পরিবহনে তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল, যা এই পরিবারটিকে কেবল জমিদার নয়, বরং তৎকালীন ‘বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি তাঁর পিতা দুর্গানারায়ণ বা পূর্বসুরির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯২৯ সালের দিকে ঘিওর ডিএন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধান জমি ও আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করেছিলেন, যা ১৯২৯ সালের ২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। উনিশ শতকের শুরুতে যখন শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিভাজন তীব্র ছিল, তখন তিনি এই স্কুলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করেছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রথম পরিচালনা কমিটিতে তিনি স্থানীয় মুসলিম সমাজসেবকদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের জন্য তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যার ফলে তৎকালীন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ছাত্ররা এসে এখানে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়।

জমিদার কালীনারায়ণ রায়চোধুরী এবং তেরশ্রী জমিদার বংশের শখ ও রুচিবোধ তৎকালীন অন্যান্য বিলাসী জমিদারদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ইংরেজ আমলের অনেক জমিদার যখন নাচ-গান, শিকার বা হাতি-ঘোড়া পোষার মতো আমোদ-প্রমোদে মত্ত থাকতেন, তখন তেরশ্রীর জমিদারদের মূল শখ ও মনোযোগ ছিল জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজকল্যাণমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রধান শখ ও আগ্রহের জায়গা ছিল বই পড়া ও জ্ঞানচর্চা, শিক্ষানুরাগ ও বিদ্যানুরাগ, থিয়েটার, নাটক ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাগান করা ও স্থাপত্য প্রীতি। কালীনারায়ণ বাবু এবং তাঁর পরিবার পড়াশোনা ও পাণ্ডিত্যের প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিলেন এবং জমিদার বাড়িতে একটি সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত লাইব্রেরি বা পাঠাগার ছিল। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন এবং আইনবিষয়ক বই সংগ্রহ করা এবং অবসরে সেগুলো পড়া ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান শখ। এই পারিবারিক শখের প্রভাব তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর ওপরও পড়েছিল, যিনি অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সেগুলোর তদারকি করা ছিল তাঁদের পারিবারিক নেশা। তৎকালীন মানিকগঞ্জ অঞ্চলে থিয়েটার বা নাট্যচর্চার যে জোয়ার এসেছিল, তার পেছনে এই জমিদার পরিবারের বড় অবদান ছিল। জমিদার বাড়ির নিজস্ব চত্বরে বা কাছারিতে বিভিন্ন উৎসব ও পূজাপার্বণে কলকাতার আদলে নাটক, যাত্রাপালা ও কবিগানের আসর বসানো হতো। গুণী শিল্পী ও কবিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের পুরস্কৃত করা এবং নিয়মিত এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা কালীনারায়ণ বাবুর অন্যতম প্রিয় শখ ছিল। তেরশ্রী জমিদার বাড়ির চারপাশ জুড়ে বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছের বাগান এবং বিশাল দীঘি ছিল। জমিদার বাড়ির যে তোরণ বা আর্চগুলোর ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়, তা থেকে বোঝা যায় যে রুচিশীল এবং দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের প্রতিও তাঁর ভালো লাগা ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাঁর শখগুলো কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল পরোপকার ও লোকহিতকর কাজের সাথে জড়িত।

মানিকগঞ্জ ও ঘিওর অঞ্চল বন্যাপ্রবণ হওয়ায় ফসলহানির বছরগুলোতে কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী প্রজাদের খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিতেন। তিনি তেরশ্রী ও এর আশেপাশের এলাকার তাঁতি এবং মৃৎশিল্পীদের (কুমোর) জন্য বিনাসুদে জমিদারি তহবিল থেকে অগ্রিম পুঁজি বা দাদন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, যাতে স্থানীয় লোকশিল্প টিকে থাকতে পারে। সেই আমলে ঘিওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। ওলাউঠা, বসন্ত বা ম্যালেরিয়ায় প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যেত। তিনি তেরশ্রীতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে কবিরাজ ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রজাদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। মানিকগঞ্জের চরাঞ্চল ও ঘিওর এলাকায় একসময় বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট ছিল। প্রজাদের জলকষ্ট দূর করতে তিনি তাঁর আমলে পুরো এস্টেটের বিভিন্ন গ্রামে নম্বরবিহীন অসংখ্য দীঘি ও কুয়া খনন করে দেন। এর মধ্যে জমিদার বাড়ির পেছনের বড় দীঘিটি আজও ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন জলাশয় হিসেবে পরিচিত। জমিদারি কাছারিতে প্রাত্যহিক যে সালিশ-বিচার হতো, সেখানে তিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও নম্র ছিলেন। কোনো প্রজা দেনার দায়ে পড়লে তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং ঋণ পরিশোধের জন্য সহজ শর্ত বা বিকল্প কাজের সুযোগ করে দিতেন। তিনি নিজে পরম ধার্মিক হিন্দু হলেও তাঁর আমলে প্রজাদের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা নেন। দুর্গাপূজার পাশাপাশি মুসলিম প্রজাদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান পাঠাতেন। কালীনারায়ণ বাবুর আমলে নির্মিত স্থাপত্যগুলো কেবল জাঁকজমক প্রদর্শনের জন্য ছিল না, বরং তার পেছনে প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য ছিল। জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বারে এবং মূল ভবনে চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির চমৎকার কাজ ছিল। বর্তমানে মূল ভবনগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও ভেতরের অন্দরমহলে প্রবেশের সেই ঐতিহাসিক খিলান বা তোরণটি ভাঙা অবস্থায় আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। জমিদার বাড়ির সদর মহলে একটি বিশাল কাছারিঘর ছিল, যা তৈরিতে তৎকালীন কলকাতার আধুনিক স্থাপত্যের প্রভাব ছিল। তিনি প্রজাদের চিকিৎসার জন্য চুন-সুরকি দিয়ে একটি ছোট পাকা ভবন নির্মাণ করেছিলেন, যা ওই অঞ্চলের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসালয় ভবন ছিল। তেরশ্রী অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দূর করতে এবং জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে তিনি বেশ কয়েকটি জলাশয় খনন করেন। জমিদার বাড়ির ঠিক পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল ঐতিহাসিক দীঘি যার চারপাশ ঘাট বাঁধানো ছিল। কথিত আছে, এর একটি ঘাট কেবল জমিদার পরিবারের অন্তপুরের নারীদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং অন্য ঘাটগুলো সাধারণ প্রজাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কেবল নিজের বাড়ির ভেতরেই নয়, প্রজারা যাতে সহজে সুপেয় পানি পায়, সেজন্য তিনি ঘিওরের বিভিন্ন জনবহুল মোড়ে এবং হাটের পাশে আরও কয়েকটি বড় পুকুর খনন করে দিয়েছিলেন। এই দীঘিগুলো শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলের কৃষিকাজেও পানির বড় উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ব্রিটিশ আমলে যেকোনো বড় এস্টেট বা জমিদারি বংশের জন্য হাতি পোষা ছিল সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং পরম আভিজাত্যের প্রতীক। তেরশ্রী এস্টেট যেহেতু মানিকগঞ্জ অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী ও বিত্তশালী জমিদারি ছিল, তাই তাদের হাতিশালে হাতি থাকা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। তৎকালীন মানিকগঞ্জ ও ঘিওরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এবং কাদা-মাটির কাঁচা রাস্তায় চলাচলের জন্য কোনো আধুনিক যানবাহন ছিল না। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন চারপাশ প্লাবিত হতো, তখন খাজনা আদায় করতে বা এস্টেটের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য জমিদার কালীনারায়ণ বাবু এবং তাঁর নায়েব-গোমস্তারা হাতির পিঠে চড়ে যাতায়াত করতেন। জমিদার বাড়ির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দুর্গোৎসব এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই উৎসবগুলোর সময়ে হাতিটিকে চমৎকারভাবে সাজিয়ে বর্ণাঠ্য শোভাযাত্রা বের করা হতো। এছাড়া জমিদার বাড়ির কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান বা বিশেষ অতিথিদের বরণ করে নিতে এই হাতির ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক। জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে হাতির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট হাতিশাল ছিল। হাতির নিয়মিত যত্ন, গোসল এবং পরিচালনার জন্য কলকাতা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে দক্ষ মাহুত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং ১৯৭১ সালের নির্মম ট্র্যাজেডির পর সেই হাতিশাল বা হাতির ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে গেছে। তবে ঘিওর ও তেরশ্রীর প্রবীণ মানুষের মুখে আজও জমিদার বাড়ির সেই জাঁকজমকপূর্ণ হাতির সওয়ারি বা হাতি পোষার গল্প রূপকথা হিসেবে বেঁচে আছে।

লোকমুখে বলা হতো, এই জমিদার বাড়িতে নাকি এক সাথে ১৩টি শ্রী বা ঐশ্বর্যের মিলন ঘটেছিল। এই তেরো শ্রী বা ১৩টি সৌন্দর্য থেকেই কালক্রমে এলাকাটির নাম হয়ে যায় তেরশ্রী। কালীনারায়ণ বাবুর স্ত্রী চম্পকাসুন্দরী দেবী ছিলেন পরম দয়ালু। লোকমুখে গল্প আছে, অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে দরিদ্র প্রজারা খাজনা দিতে না পেরে বা পারিবারিক চরম বিপদে পড়ে জমিদার বাড়িতে আসত। জমিদার কালীনারায়ণ বাবু নিয়মের খাতিরে কাছারিতে কঠোরতা দেখালেও, চম্পকাসুন্দরী দেবী অন্দরমহল থেকে দাসীদের মাধ্যমে গোপনে সেই প্রজাদের ডেকে পাঠাতেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত তহবিল বা গহনা বিক্রি করে প্রজাদের সাহায্য করতেন এবং সেই টাকা দিয়ে প্রজারা কাছারিতে জমিদার বাবুর খাজনা পরিশোধ করত। জমিদার বাবু তা বুঝতে পেরেও স্ত্রীর এই মহানুভবতা দেখে চুপ থাকতেন। বাংলার অনেক প্রাচীন দীঘির মতোই তেরশ্রী জমিদার বাড়ির পেছনের বড় দীঘিটি নিয়েও একটি অতিপ্রাকৃতিক লোকগাথা প্রচলিত ছিল। প্রাচীনকালে নাকি গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিয়ে বা বড় অনুষ্ঠান হলে এই দীঘির পাড়ে গিয়ে প্রার্থনা করা হতো। লোকবিশ্বাস ছিল, রাতে প্রার্থনা করে আসার পরদিন সকালে দীঘির ঘাটে সোনারূপা বা কাঁসার চকচকে বাসন-কোসনের থালা-বাটি ভেসে উঠত। অনুষ্ঠান শেষে সেগুলো আবার দীঘিতে ধুয়ে ফেরত দিয়ে আসতে হতো। পরবর্তীতে কোনো এক লোভী প্রজা একটি মূল্যবান থালা চুরি করে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখায় দীঘির সেই অলৌকিক ক্ষমতা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি মিষ্টি ঐতিহাসিক গল্প হলো, জমিদার কালীনারায়ণ বাবু যখন কলকাতা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে নামকরা কবিয়াল, কীর্তনীয়া বা যাত্রাদল নিয়ে আসতেন, তখন তাদের সাধারণ নৌকায় বা গরুর গাড়িতে আনা হতো না। জমিদার বাবুর ব্যক্তিগত হাতিটিকে চমৎকারভাবে সাজিয়ে ঢাক-ঠোল পিটিয়ে সেই শিল্পীদের তেরশ্রী বাজারে এবং জমিদার বাড়িতে নিয়ে আসা হতো। পুরো এলাকার মানুষ রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে হাতির পিঠে চড়ে আসা কবিয়ালদের স্বাগত জানাত, যা ওই যুগে এক বিরাট উৎসবের রূপ দিত।

​কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর শিক্ষা অনুরাগের কারণে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজের বেশ কয়েকজন নামী অধ্যাপক ও সমাজ সংস্কারকের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রায় কলকাতায় যেতেন এবং সেখান থেকে আধুনিক শিক্ষাবিদদের তেরশ্রীতে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশেই বড় হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হন। তেরশ্রী জমিদার বাড়িটি শুধু খাজনা আদায়ের কেন্দ্র ছিল না, বরং কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর আমল থেকেই এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চা, সাহিত্য এবং প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারের একটি প্রধান কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিলের যে ট্র্যাজেডির কথা বলা হয়, তা কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আর্কাইভের ‘মুক্তিযুদ্ধ দলিলপত্র’ এবং স্থানীয় অনেক গবেষণাপত্রে এটি একটি নথিবদ্ধ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত। এই সময় জমিদার পরিবারের সদস্যদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ওই পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের সরাসরি ফলাফল ছিল। তিনি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। এই পারিবারিক উদার শিক্ষার কারণেই পরবর্তীতে তাঁর সন্তান ও তেরশ্রীবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।

ধামরাইয়ের বিখ্যাত যশোমাধবের রথযাত্রার উদ্বোধনে একবার ধামরাইয়ের জমিদারদের সাথে নিমন্ত্রণের ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে তাঁর মান-অভিমান হয়। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে ঘিওর ও ধামরাইয়ের রথযাত্রার এই প্রতিযোগিতামূলক ইতিহাস ‘জমিদারি প্রতিপত্তি ও লোকায়ত উৎসবের দ্বন্দ্ব’ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয়। এই ধরনের প্রতিযোগিতা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সামাজিকভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে তৎকালীন জমিদারদের একটি বিশেষ কৌশল ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি ধামরাইয়ের রথকে টেক্কা দিতে ঘিওরের থানা সদরে নিজস্ব অর্থায়নে আরেকটি বিশাল জগন্নাথের রথ তৈরি করান এবং ধামরাইয়ের রথের দিনই ঘিওরের রথের চাকা টানার নিয়ম চালু করেন, যেন তাঁর প্রজারা ধামরাই না গিয়ে ঘিওরেই উৎসব পালন করে। দুঃখজনকভাবে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকাররা এই ঐতিহাসিক ঘিওর বাজারের রথযাত্রা উৎসবের ওপরই আক্রমণ চালিয়ে বহু হিন্দু দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছিল।

তেরশ্রী জমিদার বংশ এবং তাঁদের এলাকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত দুটি প্রধান যুদ্ধবিগ্রহ বা সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। প্রথমটি ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন এবং দ্বিতীয়টি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কালীনারায়ণ বাবুর পরিবার কেবল প্রজাহিতৈষীই ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন চরম সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। তাঁর ছেলে এবং নাতিদের আমলে তেরশ্রী জমিদার বাড়িটি ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দলের মতো সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তেরশ্রী জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। গোপনে বিপ্লবীদের সশস্ত্র লড়াই সচল রাখতে এই জমিদার পরিবার থেকে অর্থ, লজিস্টিক এবং গোপন যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হতো।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তেরশ্রী জমিদার বংশের ওপর নেমে আসে এক ভয়াবহ ও নৃশংস বিপর্যয়। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর ভোররাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং স্থানীয় আলবদর-রাজাকাররা চারপাশ থেকে তেরশ্রী গ্রাম ঘেরাও করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে তারা পুরো গ্রামে তাণ্ডব চালায়। জমিদার সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী এবং তেরশ্রী কে. এন. ইনস্টিটিউশনের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বেদজ্ঞসহ তেরশ্রীর মোট ৪৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ধরে আনে। জমিদার সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীকে চরম নির্যাতনের পর তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই দিনে প্রধান শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বেদজ্ঞসহ অন্য গ্রামবাসীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি ইতিহাসের এক করুণ ও বীরত্বপূর্ণ সত্য গল্প। পাক-হানাদার ও রাজাকাররা এই নির্মম গণহত্যার মাধ্যমে এই প্রগতিশীল জমিদার বংশের ইতি টানার চেষ্টা করেছিল। তবে এলাকাবাসী বিশ্বাস করেন, তেরশ্রীর মাটিতে তাঁদের দেওয়া শিক্ষার আলো আজও প্রজ্বলিত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেরশ্রী জমিদার পরিবারের এই আত্মত্যাগ ও ৪৩ শহীদের রক্তস্নাত ইতিহাস চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

বর্তমানে এই জমিদারি বৈভব আর নেই, তবে ১৯২২ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশন আজও মানিকগঞ্জের অন্যতম প্রধান একটি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে সগৌরবে টিকে রয়েছে এবং তাঁর নামের স্মৃতি বহন করছে। কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর ঐতিহ্য বহনকারী তেরশ্রী জমিদার বাড়ির সিংহভাগই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে বর্তমানে তাঁর চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরি সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী তাঁর পরিবার নিয়ে এখনো তেরশ্রীর সেই জমিদার বাড়ির অবশিষ্ট অংশে বসবাস করছেন। তেরশ্রী এস্টেটের বিশাল দুটি দিঘি এবং একটি জরাজীর্ণ প্রাচীন প্রবেশদ্বার আজও কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। কালীনারায়ণ বাবুর জন্ম ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তারিখ বা সাল কোনো সরকারি ঐতিহাসিক নথিপত্র বা জীবনীগ্রন্থে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত নেই। তবে তাঁর পরিবারের বংশানুক্রম এবং তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর জন্ম ও মৃত্যুর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর জীবনকালের একটি আনুমানিক সময়রেখা পাওয়া যায়। তাঁর সুনির্দিষ্ট জন্মসাল জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হয় তিনি উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক সালও ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। তবে তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী যখন ১৯২২ সালে বাবার স্মরণে তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ১৯২২ সালের আগেই কালীনারায়ণ বাবু পরলোকগমন করেছিলেন। কালীনারায়ণ বাবুর বংশের পরবর্তী জমিদার এবং উত্তরসূরি সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ বাবুর জন্ম ১৯০৬ সালে। তেরশ্রী জমিদার বংশের গোড়াপত্তনকারী এবং কালীনারায়ণ বাবুর পিতা হরেন্দ্রনারায়ণ বাবুর জন্ম-মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল বা সাল পাওয়া যায় না। তবে তিনি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তেরশ্রীতে এই এস্টেট স্থাপন করেছিলেন। শত বছর আগের গ্রামীণ জমিদারদের ব্যক্তিগত নথিপত্র সংরক্ষণ না করার প্রথার কারণে কালীনারায়ণ বাবুর সুনির্দিষ্ট জন্ম-মৃত্যুর তারিখ মেলেনি। কালীনারায়ণ বাবু কেবল একজন জমিদার ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের সমাজ সংস্কারক ও দূরদর্শী মানুষ। নিজের ক্ষমতা ও সম্পদকে তিনি ব্যক্তিগত বিলাসে ব্যয় না করে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে যেভাবে ব্যয় করেছেন, তা বর্তমান সময়ের অনেক বিত্তবানদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও প্রজাহিতৈষী আদর্শ কেবল তাঁর জীবদ্দশায়ই নয়, বরং আজও তেরশ্রীর মাটিতে টিকে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় এমন ব্যক্তিত্বের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার যোগ্য।


কপিরাইট সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিশ:
এই গুণীজন সিরিজের সম্পূর্ণ লেখা, ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণা লেখক পিযুষ পাল-এর একান্ত নিজস্ব মেধা স্বত্ব। এটি প্রথম গত ১৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে লেখকের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Facebook ID: Pijush Paul Tanoy) থেকে প্রকাশিত হয়।

ফেসবুক লিংক-

https://www.facebook.com/share/p/1T159HDsjh

লেখকের লিখিত অনুমতি ছাড়া এই প্রতিবেদনের কোনো অংশ, তথ্য বা শিরোনাম হুবহু কপি-পেস্ট করা, আংশিক পরিবর্তন করে অন্য কোনো নিউজ পোর্টাল, ব্লগ, পত্রিকা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের নামে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মেধা স্বত্ব আইনের লঙ্ঘন। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কপিরাইট আইনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


— লেখা ও গবেষণা —
পিযুষ পাল
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নতুন দেশ ২৪
মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক ঢাকার ডাক

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

তীব্র ভাঙনে দিশেহারা চরাঞ্চলের মানুষ-শেষ সম্বল ভিটামাটি হারিয়ে দিশেহারা শতাধিক পরিবার।

প্রজাহিতৈষী জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ও একটি ঐতিহাসিক এস্টেটের মহাকাব্য

তেরশ্রীর আলোকবর্তিকা: জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-১]

Update Time : ০৮:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

প্রজাহিতৈষী জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ও একটি ঐতিহাসিক এস্টেটের মহাকাব্য নিয়ে আমাদের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন ‘মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ’। আজ থাকছে এর প্রথম পর্ব।

জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন মানিকগঞ্জের তেরশ্রী এস্টেটের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী, দূরদর্শী এবং শিক্ষানুরাগী জমিদার। উনিশ শতক ও বিশ শতকের শুরুর দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে অধিকাংশ জমিদার যখন সাধারণ প্রজাদের ওপর শোষণ ও অত্যাচার চালাতেন, তখন কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি প্রজাবৎসল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এলাকার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার জন্য দিঘি ও পুকুর খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি অর্থায়ন করতেন। এছাড়া দুঃস্থদের সহায়তায় তিনি নিয়মিত দান করতেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় জনকল্যাণমূলক কাজ ছিল নিজ এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানো।

তিনি ছিলেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী এস্টেটের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য জমিদার। তাঁর স্ত্রী ছিলেন চম্পকাসুন্দরী দেবী। এই দম্পতির ঘরেই তেরশ্রী ট্র্যাজেডির মহান শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের ধারাবাহিকতা ছিল নিম্নরূপ: রামরতন রায় চৌধুরী → নরনারায়ণ রায় চৌধুরী → হরনারায়ণ রায় চৌধুরী → কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী → শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী → সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী। ইতিহাসের কিছু সূত্রে তাঁকে গাজীপুরের ভাওয়ালের রাজা কালী নারায়ণের সমসাময়িক বা একই জমিদার বংশের উপ-শাখা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসের নথিপত্রে একই সময়ে (ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে) ঢাকার অদূরে গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটেও “রাজা কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী” নামে আরেকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। ভাওয়ালের কালী নারায়ণ ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি পান এবং ঢাকার নর্থব্রুক হলের সংবর্ধনাসহ ঢাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাবশালী ছিলেন। অন্যদিকে, মানিকগঞ্জের তেরশ্রীর কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী আঞ্চলিকভাবে শিক্ষা বিস্তার ও লোকজ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় বেশি মনোযোগী ছিলেন।

তৎকালীন অনগ্রসর মানিকগঞ্জ অঞ্চলে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য ব্রিটিশ আমলে ১৯২২ সালে তাঁর নামানুসারে ও তাঁর জমিদারির অর্থায়নে তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশন (Terosree K.N. Institution) প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ প্রশাসনের সিএস (Cadastral Survey) ও আরএস (Revision Survey) খতিয়ানে তেরশ্রী এস্টেটের যে আয়তন ও রাজস্ব আয়ের বিবরণ পাওয়া যায়, তা তৎকালীন মানিকগঞ্জ সাব-ডিভিশনে তাদের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির প্রমাণ দেয়। এই নথিগুলোতে অনেক সময় তাদের দান করা জমির পরিমাণ ও শর্তগুলো দলিলাকারে সংরক্ষিত আছে, যা আইনিভাবে ওই বিদ্যালয়গুলোর ভিত্তি মজবুত করেছিল। এই বিদ্যালয়টি মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে আজও শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি ১৯২২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন ব্রিটিশ শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম মেনে বিদ্যালয়ের নিজস্ব নামে বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি এবং নগদ এককালীন তহবিল দান করেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মানিকগঞ্জ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ ও কৃষক পরিবারের সন্তানেরা যেন নামমাত্র খরচে আধুনিক মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে। ১৯২২ সালে কালীনারায়ণ বাবুর স্মরণে তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী ঘিওর এলাকার এক বিশাল নিজস্ব জমির ওপর এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়ের মূল ভবন, খেলার মাঠ এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কয়েক একর জমি এই সম্পত্তি থেকে দান করা হয়। ১৯৪২ সালে মানিকগঞ্জ জেলার প্রথম কলেজ হিসেবে তেরশ্রী কলেজ তাঁদের দান করা জমিতে এবং নিজস্ব অর্থায়নে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে এটি মানিকগঞ্জ জেলা সদরে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান বিখ্যাত সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ নামে রূপ নেয়।

কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী শুধু তেরশ্রীতেই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী ঘিওর হাটের তৎকালীন বড় ব্যবসায়ীদের অনুরোধে এবং শিক্ষার প্রসারে আরেকটি বড় অবদান রেখেছিলেন। সেই সময়ে তেরশ্রী এস্টেট অত্র অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বাজার কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ঘিওর এবং তেরশ্রীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নদীপথে পণ্য পরিবহনে তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল, যা এই পরিবারটিকে কেবল জমিদার নয়, বরং তৎকালীন ‘বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি তাঁর পিতা দুর্গানারায়ণ বা পূর্বসুরির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯২৯ সালের দিকে ঘিওর ডিএন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধান জমি ও আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করেছিলেন, যা ১৯২৯ সালের ২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। উনিশ শতকের শুরুতে যখন শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিভাজন তীব্র ছিল, তখন তিনি এই স্কুলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করেছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রথম পরিচালনা কমিটিতে তিনি স্থানীয় মুসলিম সমাজসেবকদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের জন্য তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যার ফলে তৎকালীন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ছাত্ররা এসে এখানে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়।

জমিদার কালীনারায়ণ রায়চোধুরী এবং তেরশ্রী জমিদার বংশের শখ ও রুচিবোধ তৎকালীন অন্যান্য বিলাসী জমিদারদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ইংরেজ আমলের অনেক জমিদার যখন নাচ-গান, শিকার বা হাতি-ঘোড়া পোষার মতো আমোদ-প্রমোদে মত্ত থাকতেন, তখন তেরশ্রীর জমিদারদের মূল শখ ও মনোযোগ ছিল জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজকল্যাণমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রধান শখ ও আগ্রহের জায়গা ছিল বই পড়া ও জ্ঞানচর্চা, শিক্ষানুরাগ ও বিদ্যানুরাগ, থিয়েটার, নাটক ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাগান করা ও স্থাপত্য প্রীতি। কালীনারায়ণ বাবু এবং তাঁর পরিবার পড়াশোনা ও পাণ্ডিত্যের প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিলেন এবং জমিদার বাড়িতে একটি সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত লাইব্রেরি বা পাঠাগার ছিল। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন এবং আইনবিষয়ক বই সংগ্রহ করা এবং অবসরে সেগুলো পড়া ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান শখ। এই পারিবারিক শখের প্রভাব তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর ওপরও পড়েছিল, যিনি অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সেগুলোর তদারকি করা ছিল তাঁদের পারিবারিক নেশা। তৎকালীন মানিকগঞ্জ অঞ্চলে থিয়েটার বা নাট্যচর্চার যে জোয়ার এসেছিল, তার পেছনে এই জমিদার পরিবারের বড় অবদান ছিল। জমিদার বাড়ির নিজস্ব চত্বরে বা কাছারিতে বিভিন্ন উৎসব ও পূজাপার্বণে কলকাতার আদলে নাটক, যাত্রাপালা ও কবিগানের আসর বসানো হতো। গুণী শিল্পী ও কবিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের পুরস্কৃত করা এবং নিয়মিত এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা কালীনারায়ণ বাবুর অন্যতম প্রিয় শখ ছিল। তেরশ্রী জমিদার বাড়ির চারপাশ জুড়ে বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছের বাগান এবং বিশাল দীঘি ছিল। জমিদার বাড়ির যে তোরণ বা আর্চগুলোর ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়, তা থেকে বোঝা যায় যে রুচিশীল এবং দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের প্রতিও তাঁর ভালো লাগা ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাঁর শখগুলো কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল পরোপকার ও লোকহিতকর কাজের সাথে জড়িত।

মানিকগঞ্জ ও ঘিওর অঞ্চল বন্যাপ্রবণ হওয়ায় ফসলহানির বছরগুলোতে কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী প্রজাদের খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিতেন। তিনি তেরশ্রী ও এর আশেপাশের এলাকার তাঁতি এবং মৃৎশিল্পীদের (কুমোর) জন্য বিনাসুদে জমিদারি তহবিল থেকে অগ্রিম পুঁজি বা দাদন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, যাতে স্থানীয় লোকশিল্প টিকে থাকতে পারে। সেই আমলে ঘিওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। ওলাউঠা, বসন্ত বা ম্যালেরিয়ায় প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যেত। তিনি তেরশ্রীতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে কবিরাজ ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রজাদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। মানিকগঞ্জের চরাঞ্চল ও ঘিওর এলাকায় একসময় বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট ছিল। প্রজাদের জলকষ্ট দূর করতে তিনি তাঁর আমলে পুরো এস্টেটের বিভিন্ন গ্রামে নম্বরবিহীন অসংখ্য দীঘি ও কুয়া খনন করে দেন। এর মধ্যে জমিদার বাড়ির পেছনের বড় দীঘিটি আজও ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন জলাশয় হিসেবে পরিচিত। জমিদারি কাছারিতে প্রাত্যহিক যে সালিশ-বিচার হতো, সেখানে তিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও নম্র ছিলেন। কোনো প্রজা দেনার দায়ে পড়লে তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং ঋণ পরিশোধের জন্য সহজ শর্ত বা বিকল্প কাজের সুযোগ করে দিতেন। তিনি নিজে পরম ধার্মিক হিন্দু হলেও তাঁর আমলে প্রজাদের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা নেন। দুর্গাপূজার পাশাপাশি মুসলিম প্রজাদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান পাঠাতেন। কালীনারায়ণ বাবুর আমলে নির্মিত স্থাপত্যগুলো কেবল জাঁকজমক প্রদর্শনের জন্য ছিল না, বরং তার পেছনে প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য ছিল। জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বারে এবং মূল ভবনে চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির চমৎকার কাজ ছিল। বর্তমানে মূল ভবনগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও ভেতরের অন্দরমহলে প্রবেশের সেই ঐতিহাসিক খিলান বা তোরণটি ভাঙা অবস্থায় আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। জমিদার বাড়ির সদর মহলে একটি বিশাল কাছারিঘর ছিল, যা তৈরিতে তৎকালীন কলকাতার আধুনিক স্থাপত্যের প্রভাব ছিল। তিনি প্রজাদের চিকিৎসার জন্য চুন-সুরকি দিয়ে একটি ছোট পাকা ভবন নির্মাণ করেছিলেন, যা ওই অঞ্চলের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসালয় ভবন ছিল। তেরশ্রী অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দূর করতে এবং জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে তিনি বেশ কয়েকটি জলাশয় খনন করেন। জমিদার বাড়ির ঠিক পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল ঐতিহাসিক দীঘি যার চারপাশ ঘাট বাঁধানো ছিল। কথিত আছে, এর একটি ঘাট কেবল জমিদার পরিবারের অন্তপুরের নারীদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং অন্য ঘাটগুলো সাধারণ প্রজাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কেবল নিজের বাড়ির ভেতরেই নয়, প্রজারা যাতে সহজে সুপেয় পানি পায়, সেজন্য তিনি ঘিওরের বিভিন্ন জনবহুল মোড়ে এবং হাটের পাশে আরও কয়েকটি বড় পুকুর খনন করে দিয়েছিলেন। এই দীঘিগুলো শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলের কৃষিকাজেও পানির বড় উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ব্রিটিশ আমলে যেকোনো বড় এস্টেট বা জমিদারি বংশের জন্য হাতি পোষা ছিল সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং পরম আভিজাত্যের প্রতীক। তেরশ্রী এস্টেট যেহেতু মানিকগঞ্জ অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী ও বিত্তশালী জমিদারি ছিল, তাই তাদের হাতিশালে হাতি থাকা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। তৎকালীন মানিকগঞ্জ ও ঘিওরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এবং কাদা-মাটির কাঁচা রাস্তায় চলাচলের জন্য কোনো আধুনিক যানবাহন ছিল না। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন চারপাশ প্লাবিত হতো, তখন খাজনা আদায় করতে বা এস্টেটের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য জমিদার কালীনারায়ণ বাবু এবং তাঁর নায়েব-গোমস্তারা হাতির পিঠে চড়ে যাতায়াত করতেন। জমিদার বাড়ির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দুর্গোৎসব এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই উৎসবগুলোর সময়ে হাতিটিকে চমৎকারভাবে সাজিয়ে বর্ণাঠ্য শোভাযাত্রা বের করা হতো। এছাড়া জমিদার বাড়ির কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান বা বিশেষ অতিথিদের বরণ করে নিতে এই হাতির ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক। জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে হাতির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট হাতিশাল ছিল। হাতির নিয়মিত যত্ন, গোসল এবং পরিচালনার জন্য কলকাতা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে দক্ষ মাহুত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং ১৯৭১ সালের নির্মম ট্র্যাজেডির পর সেই হাতিশাল বা হাতির ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে গেছে। তবে ঘিওর ও তেরশ্রীর প্রবীণ মানুষের মুখে আজও জমিদার বাড়ির সেই জাঁকজমকপূর্ণ হাতির সওয়ারি বা হাতি পোষার গল্প রূপকথা হিসেবে বেঁচে আছে।

লোকমুখে বলা হতো, এই জমিদার বাড়িতে নাকি এক সাথে ১৩টি শ্রী বা ঐশ্বর্যের মিলন ঘটেছিল। এই তেরো শ্রী বা ১৩টি সৌন্দর্য থেকেই কালক্রমে এলাকাটির নাম হয়ে যায় তেরশ্রী। কালীনারায়ণ বাবুর স্ত্রী চম্পকাসুন্দরী দেবী ছিলেন পরম দয়ালু। লোকমুখে গল্প আছে, অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে দরিদ্র প্রজারা খাজনা দিতে না পেরে বা পারিবারিক চরম বিপদে পড়ে জমিদার বাড়িতে আসত। জমিদার কালীনারায়ণ বাবু নিয়মের খাতিরে কাছারিতে কঠোরতা দেখালেও, চম্পকাসুন্দরী দেবী অন্দরমহল থেকে দাসীদের মাধ্যমে গোপনে সেই প্রজাদের ডেকে পাঠাতেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত তহবিল বা গহনা বিক্রি করে প্রজাদের সাহায্য করতেন এবং সেই টাকা দিয়ে প্রজারা কাছারিতে জমিদার বাবুর খাজনা পরিশোধ করত। জমিদার বাবু তা বুঝতে পেরেও স্ত্রীর এই মহানুভবতা দেখে চুপ থাকতেন। বাংলার অনেক প্রাচীন দীঘির মতোই তেরশ্রী জমিদার বাড়ির পেছনের বড় দীঘিটি নিয়েও একটি অতিপ্রাকৃতিক লোকগাথা প্রচলিত ছিল। প্রাচীনকালে নাকি গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিয়ে বা বড় অনুষ্ঠান হলে এই দীঘির পাড়ে গিয়ে প্রার্থনা করা হতো। লোকবিশ্বাস ছিল, রাতে প্রার্থনা করে আসার পরদিন সকালে দীঘির ঘাটে সোনারূপা বা কাঁসার চকচকে বাসন-কোসনের থালা-বাটি ভেসে উঠত। অনুষ্ঠান শেষে সেগুলো আবার দীঘিতে ধুয়ে ফেরত দিয়ে আসতে হতো। পরবর্তীতে কোনো এক লোভী প্রজা একটি মূল্যবান থালা চুরি করে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখায় দীঘির সেই অলৌকিক ক্ষমতা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি মিষ্টি ঐতিহাসিক গল্প হলো, জমিদার কালীনারায়ণ বাবু যখন কলকাতা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে নামকরা কবিয়াল, কীর্তনীয়া বা যাত্রাদল নিয়ে আসতেন, তখন তাদের সাধারণ নৌকায় বা গরুর গাড়িতে আনা হতো না। জমিদার বাবুর ব্যক্তিগত হাতিটিকে চমৎকারভাবে সাজিয়ে ঢাক-ঠোল পিটিয়ে সেই শিল্পীদের তেরশ্রী বাজারে এবং জমিদার বাড়িতে নিয়ে আসা হতো। পুরো এলাকার মানুষ রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে হাতির পিঠে চড়ে আসা কবিয়ালদের স্বাগত জানাত, যা ওই যুগে এক বিরাট উৎসবের রূপ দিত।

​কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর শিক্ষা অনুরাগের কারণে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজের বেশ কয়েকজন নামী অধ্যাপক ও সমাজ সংস্কারকের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রায় কলকাতায় যেতেন এবং সেখান থেকে আধুনিক শিক্ষাবিদদের তেরশ্রীতে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশেই বড় হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হন। তেরশ্রী জমিদার বাড়িটি শুধু খাজনা আদায়ের কেন্দ্র ছিল না, বরং কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর আমল থেকেই এটি হয়ে উঠেছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চা, সাহিত্য এবং প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারের একটি প্রধান কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিলের যে ট্র্যাজেডির কথা বলা হয়, তা কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আর্কাইভের ‘মুক্তিযুদ্ধ দলিলপত্র’ এবং স্থানীয় অনেক গবেষণাপত্রে এটি একটি নথিবদ্ধ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত। এই সময় জমিদার পরিবারের সদস্যদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ওই পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের সরাসরি ফলাফল ছিল। তিনি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। এই পারিবারিক উদার শিক্ষার কারণেই পরবর্তীতে তাঁর সন্তান ও তেরশ্রীবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।

ধামরাইয়ের বিখ্যাত যশোমাধবের রথযাত্রার উদ্বোধনে একবার ধামরাইয়ের জমিদারদের সাথে নিমন্ত্রণের ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে তাঁর মান-অভিমান হয়। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে ঘিওর ও ধামরাইয়ের রথযাত্রার এই প্রতিযোগিতামূলক ইতিহাস ‘জমিদারি প্রতিপত্তি ও লোকায়ত উৎসবের দ্বন্দ্ব’ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয়। এই ধরনের প্রতিযোগিতা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সামাজিকভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে তৎকালীন জমিদারদের একটি বিশেষ কৌশল ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি ধামরাইয়ের রথকে টেক্কা দিতে ঘিওরের থানা সদরে নিজস্ব অর্থায়নে আরেকটি বিশাল জগন্নাথের রথ তৈরি করান এবং ধামরাইয়ের রথের দিনই ঘিওরের রথের চাকা টানার নিয়ম চালু করেন, যেন তাঁর প্রজারা ধামরাই না গিয়ে ঘিওরেই উৎসব পালন করে। দুঃখজনকভাবে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকাররা এই ঐতিহাসিক ঘিওর বাজারের রথযাত্রা উৎসবের ওপরই আক্রমণ চালিয়ে বহু হিন্দু দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছিল।

তেরশ্রী জমিদার বংশ এবং তাঁদের এলাকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত দুটি প্রধান যুদ্ধবিগ্রহ বা সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। প্রথমটি ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন এবং দ্বিতীয়টি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কালীনারায়ণ বাবুর পরিবার কেবল প্রজাহিতৈষীই ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন চরম সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। তাঁর ছেলে এবং নাতিদের আমলে তেরশ্রী জমিদার বাড়িটি ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দলের মতো সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তেরশ্রী জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। গোপনে বিপ্লবীদের সশস্ত্র লড়াই সচল রাখতে এই জমিদার পরিবার থেকে অর্থ, লজিস্টিক এবং গোপন যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হতো।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তেরশ্রী জমিদার বংশের ওপর নেমে আসে এক ভয়াবহ ও নৃশংস বিপর্যয়। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর ভোররাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং স্থানীয় আলবদর-রাজাকাররা চারপাশ থেকে তেরশ্রী গ্রাম ঘেরাও করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে তারা পুরো গ্রামে তাণ্ডব চালায়। জমিদার সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী এবং তেরশ্রী কে. এন. ইনস্টিটিউশনের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বেদজ্ঞসহ তেরশ্রীর মোট ৪৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ধরে আনে। জমিদার সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীকে চরম নির্যাতনের পর তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই দিনে প্রধান শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বেদজ্ঞসহ অন্য গ্রামবাসীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি ইতিহাসের এক করুণ ও বীরত্বপূর্ণ সত্য গল্প। পাক-হানাদার ও রাজাকাররা এই নির্মম গণহত্যার মাধ্যমে এই প্রগতিশীল জমিদার বংশের ইতি টানার চেষ্টা করেছিল। তবে এলাকাবাসী বিশ্বাস করেন, তেরশ্রীর মাটিতে তাঁদের দেওয়া শিক্ষার আলো আজও প্রজ্বলিত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেরশ্রী জমিদার পরিবারের এই আত্মত্যাগ ও ৪৩ শহীদের রক্তস্নাত ইতিহাস চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

বর্তমানে এই জমিদারি বৈভব আর নেই, তবে ১৯২২ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশন আজও মানিকগঞ্জের অন্যতম প্রধান একটি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে সগৌরবে টিকে রয়েছে এবং তাঁর নামের স্মৃতি বহন করছে। কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর ঐতিহ্য বহনকারী তেরশ্রী জমিদার বাড়ির সিংহভাগই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে বর্তমানে তাঁর চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরি সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী তাঁর পরিবার নিয়ে এখনো তেরশ্রীর সেই জমিদার বাড়ির অবশিষ্ট অংশে বসবাস করছেন। তেরশ্রী এস্টেটের বিশাল দুটি দিঘি এবং একটি জরাজীর্ণ প্রাচীন প্রবেশদ্বার আজও কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। কালীনারায়ণ বাবুর জন্ম ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তারিখ বা সাল কোনো সরকারি ঐতিহাসিক নথিপত্র বা জীবনীগ্রন্থে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত নেই। তবে তাঁর পরিবারের বংশানুক্রম এবং তাঁর পুত্র শহীদ সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর জন্ম ও মৃত্যুর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর জীবনকালের একটি আনুমানিক সময়রেখা পাওয়া যায়। তাঁর সুনির্দিষ্ট জন্মসাল জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হয় তিনি উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক সালও ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। তবে তাঁর পুত্র সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ রায়চৌধুরী যখন ১৯২২ সালে বাবার স্মরণে তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ১৯২২ সালের আগেই কালীনারায়ণ বাবু পরলোকগমন করেছিলেন। কালীনারায়ণ বাবুর বংশের পরবর্তী জমিদার এবং উত্তরসূরি সিদ্ধেশ্বরীপ্রসাদ বাবুর জন্ম ১৯০৬ সালে। তেরশ্রী জমিদার বংশের গোড়াপত্তনকারী এবং কালীনারায়ণ বাবুর পিতা হরেন্দ্রনারায়ণ বাবুর জন্ম-মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল বা সাল পাওয়া যায় না। তবে তিনি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তেরশ্রীতে এই এস্টেট স্থাপন করেছিলেন। শত বছর আগের গ্রামীণ জমিদারদের ব্যক্তিগত নথিপত্র সংরক্ষণ না করার প্রথার কারণে কালীনারায়ণ বাবুর সুনির্দিষ্ট জন্ম-মৃত্যুর তারিখ মেলেনি। কালীনারায়ণ বাবু কেবল একজন জমিদার ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের সমাজ সংস্কারক ও দূরদর্শী মানুষ। নিজের ক্ষমতা ও সম্পদকে তিনি ব্যক্তিগত বিলাসে ব্যয় না করে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে যেভাবে ব্যয় করেছেন, তা বর্তমান সময়ের অনেক বিত্তবানদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও প্রজাহিতৈষী আদর্শ কেবল তাঁর জীবদ্দশায়ই নয়, বরং আজও তেরশ্রীর মাটিতে টিকে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় এমন ব্যক্তিত্বের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার যোগ্য।


কপিরাইট সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিশ:
এই গুণীজন সিরিজের সম্পূর্ণ লেখা, ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণা লেখক পিযুষ পাল-এর একান্ত নিজস্ব মেধা স্বত্ব। এটি প্রথম গত ১৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে লেখকের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Facebook ID: Pijush Paul Tanoy) থেকে প্রকাশিত হয়।

ফেসবুক লিংক-

https://www.facebook.com/share/p/1T159HDsjh

লেখকের লিখিত অনুমতি ছাড়া এই প্রতিবেদনের কোনো অংশ, তথ্য বা শিরোনাম হুবহু কপি-পেস্ট করা, আংশিক পরিবর্তন করে অন্য কোনো নিউজ পোর্টাল, ব্লগ, পত্রিকা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের নামে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মেধা স্বত্ব আইনের লঙ্ঘন। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কপিরাইট আইনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


— লেখা ও গবেষণা —
পিযুষ পাল
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নতুন দেশ ২৪
মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক ঢাকার ডাক