০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তেরশ্রী জনপদের উৎপত্তি ও জমিদারি প্রতিষ্ঠা

মানিকগঞ্জের ইতিহাস: শিক্ষা-ঐতিহ্যে তেরশ্রী জমিদার বাড়ি এবং তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশনের জন্মকথা [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ]

​মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার উত্তর প্রান্তে কালিগঙ্গা নদীর কাটালখালি খালের পাশে ছায়াঘেরা ঐশ্বর্যমণ্ডিত গ্রাম তেরশ্রী। তেরশ্রীর শ্রীবৃদ্ধি করেছিল যে বাড়ি, যাকে ঘিরেই অনেক গল্প-কাহিনী আর কথামালা তা হলো ‘তেরশ্রী জমিদার বাড়ি’। ‘তেরশ্রী এস্টেট’ নামে এ জমিদারির পতন।

ঘিওর উপজেলা সদর থেকে দুই-আড়াই কি.মি. উত্তরে তেরশ্রী জনপদ। এখানে জমিদার বাড়ির ভগ্নাশেষের সাথে মিশে আছে কিছু স্মৃতি আর আছে প্রীতময় ঐতিহ্য ও গৌরবাণিত অতীত।
​কয়েক শতাব্দীর স্মৃতির ধারক এ বাড়িটি। এ বাড়ির এক দূরদর্শী পুরুষ ১৯৪৭ এর দেশবিভাগ উত্তরকালে কলকাতায় আশ্রয় নেন। এখানে আছেন তেরশ্রী জমিদারের বর্তমান উত্তরসূরি সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী।

​জমিদার শব্দ শুনলেই, আমাদের অত্যাচারী কোন চরিত্র কল্পনায় ভেসে উঠে। তবে তেরশ্রী জমিদারগণ বংশপরম্পরায় এমনটি ছিলেন না। তাদের জনহিতকর কর্মযজ্ঞ দেখলেই সহজে অনুমান করা যায়। এই জমিদার বাড়ির জমিদারগণ ছিলেন অত্যন্ত সৌখিন ও রুচিশীল মানুষ। এঁরা জমিদারি ও প্রজাহিতৈষী কাজ করেই সময় কাটাতেন।

​জমিদার বাড়ির বিভিন্ন ভবন আর মন্দিরের নির্মাণশৈলী ছিল উন্নত রুচির পরিচায়ক। তেরশ্রী জমিদার বাড়ির স্থাপত্যকলার নিদর্শন এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্তমানে আর পর্যালোচনার সুযোগ নেই। কালের বিবর্তনে এবং সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

​তেরশ্রী জমিদারির স্থাপনকর্তা রামরতন রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন নবাব মীর কাসিমের দেওয়ান। ১৭৬৩ সালে মুঙ্গের যুদ্ধে মীর কাসিমের পরাজয়ের পর সবকিছু যখন এলোমেলো হয়ে যায়, তখন রামরতন রায়চৌধুরী জীবনের প্রয়োজনে চাপাইনবাবগঞ্জে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। শত্রুপক্ষ পিছু নেয়ায় জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৌলতপুর থানার ধামস্বর গ্রামে বসতি গড়েন। এখানে বেশ কিছুদিন বসবাস করার পর, রামরতনের পুত্র নর নারায়ণ রায়চৌধুরী ঘিওরের মাইলাগী গ্রামে অবস্থান নেন।

কালের পরিক্রমায় রামরতন বাবু প্রাগুক্ত জমিদার বাড়িতে দৃষ্টিবন্ধন এক মন্দির স্থাপন করেন। রামরতনের আত্মজ হরনারায়ণ রায়চৌধুরীর হাতে গৌরব-সৌরভের এই জমিদার বাড়ির পূর্ণাবয়ব স্থাপিত হয়।

হরনারায়ণ রায়চৌধুরী ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। নানান প্রতিবন্ধকতা ও বৈরিতায়ও তিনি সংগ্রামী জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ভাবলেন, ইংরেজদের সঙ্গে শুধু শত্রুতা করে লাভ হবে না। বিচক্ষণ রায়চৌধুরী মহোদয় এক্ষেত্রে মহামতি গৌতম বুদ্ধকে অনুসরণ করেন। তিনি বন্ধুত্ব দিয়ে ইংরেজদের সকল শত্রুতাকে জয়াজে সচেষ্ট হন। এভাবে স্বীয় বুদ্ধিবলে ইংরেজদের সাথে সৌহার্দ স্থাপন করে তেরশ্রী এস্টেটের জমিদারি প্রাপ্ত হন।

​জমিদারি প্রাপ্তির পর এ পরিবার রায়চৌধুরী উপাধি ব্যবহার শুরু করেন। যদিও এঁরা বংশগতভাবে ছিলেন বাগচী। বংশগৌরব ও আভিজাত্যবাদ এঁদেরকে কখনো আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। রেওয়াজ অনুযায়ী এ পরিবারের সদস্যগণ বাড়িতেই বিদ্যাশিক্ষা ও সংগীত-সংস্কৃতির চর্চা করতেন। তবে পরবর্তীতে এ রীতি আর বজায় থাকেনি। উত্তর-প্রজন্ম স্কুল-কলেজে বিদ্যা গ্রহণে ব্রতী হন।

​হরনারায়ণ রায়চৌধুরী ও কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী তেরশ্রী এস্টেটের বাইরেও শ্রীহট্টের (সিলেটের) বিজোড়া পরগণায় ও পাঁচানী এস্টেটে জমিদারির প্রসার ঘটান।
​জমিদারদের বংশ তালিকা :
​রামরতন রায়চৌধুরী
​নরনারায়ণ রায়চৌধুরী
​হরনারায়ণ রায়চৌধুরী
​কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী + জ্যোতির্ময়ী দেবী
= ​জ্যোতিপ্রসাদ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী + গায়ত্রী দেবী চৌধুরাণী
​= অঞ্জলি রায়চৌধুরী
​সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী
​বীণা রায়চৌধুরী
​এদের বংশধরদের কেউ কেউ পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার আলীপুরে রয়েছেন।

​তেরশ্রী জমিদারগণ জনবিচ্ছিন্ন শাসক ছিলেন না। তবে জমিদারি টিকিয়ে রাখতে ইংরেজ সরকার প্রবর্তিত অনেক আইনই তাঁদেরকে পালন করতে হতো। এক্ষেত্রে এঁরা ছিলেন কৌশলী এবং জনহিতার্থী। তৎকালে দুর্গোৎসব ছিল এ জমিদারির অনুভূতি ও আড়ম্বরের প্রতীক। আনন্দ-উৎসব আর আপ্যায়নে এ উৎসব রাজ্য জুড়ে সাড়া ফেলত। প্রজা সাধারণ পূজার্চনার সকল পর্বে ভক্তি-গীতিক ও সানন্দ চিত্তে অংশ নিতেন। সর্বজনীনতাই ছিল এ উৎসবের মূল প্রেক্ষাপট। আরেক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ছিল দোল ও হোলি।
তেরশ্রী জমিদারির আভিজাত্যের আরেক নিদর্শন সুউচ্চ নহবত খানা। বিভিন্ন উৎসব পার্বণে সানাইসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর মূর্ছনায় বিমোহিত হতো সবার হৃদয়। নহবত খানাটি ছিল এ অঞ্চলের এক সুরেলা ভোরের পাখি।

তেরশ্রীর জমিদারদের নানা কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট মহাত্মাগণ :
জমিদার হরনারায়ণ রায়চৌধুরী: জমিদার ভবন, কাচারী বাড়ি ও নাটমন্দির স্থাপন করেন। তিনি প্রজা বৎসল, শান্তিপ্রিয় ও আড়ম্বরহীন জীবনযাপনের অধিকারী এক যোগী পুরুষ।

জমিদার কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী: ইনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীলচাষ নীতির বিরুদ্ধেচারণ করেন। এক্ষেত্রে তাঁর সাহসী ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি শ্রীঘরনগর হাটের (যা পরবর্তীতে ঘিওরে স্থানান্তরিত) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিভিন্ন সুপেয় জলাধার-কূপ-ইন্দ্রা ও মন্দির নির্মাণ করেন। নানা দুর্ভিক্ষে এ জমিদার প্রজা কল্যাণে সহযোগিতার হাত বাড়ান যা আজও অনুকরণীয়-অনুসরণীয়।

​জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী: গৃহ শিক্ষকগণের যত্ন ও সহায়তায় বাবু সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। ইনি ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক দার্শনিক। শিক্ষা দর্শনকে তিনি জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। বিচিত্র পুস্তক সংগ্রহ-সংরক্ষণ ও পাঠে এই রত্নপুরুষ ছিলেন অগ্রণী। তাঁর প্রচেষ্টায় নিজ গৃহে এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল বিজ্ঞান, সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অসাধারণ ঝোঁক ছিল। এসব ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভাও অনন্য। তাঁর প্রতিভা বহুমুখী ও সর্বগামী। ১৯২২ সালে এই মহামানব পিতার পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থে ‘তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। স্মর্তব্য, এ কর্মযজ্ঞে পেছনের উৎসাহী কারিগর তাঁর প্রথম স্ত্রী জ্যোতির্ময়ী দেবী।

​তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশনের জন্মকথা
জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী মাত্র পনেরো বছর বয়সে পিতৃহারা হন। ফলে আকস্মিক বাস্তবতায় জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পরে। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে অল্প বয়সেই তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রাম গোপালপুরের ধনশালী রায়বাহাদুর জমিদার পরিবারের একমাত্র কন্যা জ্যোতির্ময়ী দেবীকে মাত্র ষোল বছর বয়সে বিয়ে করেন। জ্যোতির্ময়ী দেবী শ্বশুর বাড়িতে এসে দেখেন এই এস্টেটে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল বা সভা সমাজের অনুগ্রহ প্রতিষ্ঠানের কোনটিই নেই। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শ্বশুর বাড়ি ত্যাগ করে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্বামীর কাছে বায়না ধরেন “আপনি প্রজা কল্যাণের প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন করলেই আমি আপনার সঙ্গে শ্বশুরালয়ে ফিরব।” জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ স্ত্রীর কথা রাখতে প্রায় চল্লিশ বিঘা ভূসম্পত্তি দানসহ প্রতিষ্ঠা করেন ‘তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন’।

দুর্ভাগ্য! জ্যোতির্ময়ী দেবী তাঁর ইচ্ছে পূরণের এ মহাকীর্তি দেখে যেতে পারেননি। মাত্র দুই বৎসরের বিবাহিত জীবনে প্রথম সন্তান জন্মদানের মাত্র চার ঘণ্টা পর তিনি পরলোক গমন করেন।

বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিও ছিলেন ৮টি ভাষায় সুপণ্ডিত। গীতাকোরআন, বাইবেল ও ত্রিপিটক এই চারটি ধর্মগ্রন্থে ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। তিনি ছিলেন আজন্ম একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। নিজে ওয়্যারলেস তৈরি করে তিনি বৃটেনের রানীর সাথে কথা বলতেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন স্থপতি। কবিগুরু শান্ত নিকেতন ট্রাস্টি বডির একজন সদস্য হিসেবে সেখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেন। তেরশ্রী জনপদে বহু মন্দিরের পাশাপাশি তিনি অনেক মসজিদকেও ভূসম্পত্তি দান করেন।

সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী সিলেটের ছাতিয়ান হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। মানিকগঞ্জ মহকুমার প্রথম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘তেরশ্রী কলেজ’ (১৯৪২) প্রতিষ্ঠায়ও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসাকল, ডাকঘর, তেরশ্রী বাজারসহ অসংখ্য জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ ১৯৭১ সালে মুক্তিকামী বাঙালির এক সফল সংগঠক। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হতে আগত উৎবাতদের পরম যত্নে আশ্রয় দেন নিজ বাড়িতে। ফলে জমিদার ও তাঁর বাড়িটি পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের টার্গেট হয়।

এছাড়া এই প্রতিভাবান ব্যক্তি ঢাকা যাদুঘর ও বাংলা একাডেমিতে বহু দুর্লভাপুস্তক, অর্থ ও রাজকীয় সাজ সরঞ্জাম দান করেন। সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনচেতা মানুষ। জমিদার হয়েও স্বাধীন ভারত ভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আত্মনিবেদন করেন। গোলামীর শৃঙ্খল ছিন্ন করার লক্ষ্যে গ্রহণ করেন স্বাধীনতার বীজমন্ত্র, যোগ দিয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজ। এ বাহিনীর একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সেই সময়ই মৃত্যুবধি তিনি স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশীয় পণ্যে জীবন ধারণে অভ্যস্ত হন।
​বিদগ্ধ পাঠক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল সবার কাছে। কলকাতার মানিকগঞ্জ সুহৃদ সম্মলনী প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল।

১৯৭১ সালে ২২ নভেম্বর পাকবাহিনী নির্মমভাবে মহামতি জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরীকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জীবন্ত অগ্নিগ্ধ করে হত্যা করার দ্বিতীয় নজির আছে বলে আমাদের জানা নেই। সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী দ্বিতীয় দার পরিগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জের মিতরা গ্রামের বিখ্যাত ভট্টাচার্য পরিবারের কন্যা গায়ত্রী দেবীকে। তাঁদের ঘরে এক পুত্র এবং দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম কন্যা অঞ্জলি রায়চৌধুরী কলকাতার এক স্কুলের শিক্ষয়িত্রী। পুত্র সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী তেরশ্রী জমিদারেশনের শিক্ষকতা পেশা শেষ করে অবসর গ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ কন্যা বীণা রায়ও শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এক অনিবর্ষণীয় দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সোমেশ্বর বাবুর সহধর্মিণী শ্রীমতী শুকলা গোস্বামীও একই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন।

শিক্ষা-শিক্ষকতা-জ্ঞান বিতরণ ও কৃষ্টি-কালচারে এক অনন্য পরিবার ‘তেরশ্রী জমিদার বাড়ি’। কালের গতি- প্রকৃতির পরিবর্তন-বিবর্তনে এ পরিবারের অবদান এ অঞ্চলের মানুষকে সৎকর্মের উদ্দীপ্ত করে চলেছে। সামগ্রিক বিচারে, শিক্ষা-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এ অঞ্চলবাসী সবাই তাঁদের নিকটে ঋণী-কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ।

​তথ্যসূত্র :
১। সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী, জমিদারপুত্র, তেরশ্রী এস্টেট।
২। বিজয় দিবসের সুধী সংবর্ধনা ‘স্মরণিকা’, ঘিওর উপজেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ১৯৭৫।
৩। মানিকগঞ্জের শত মানিক, সম্পাদক: মোঃ আজাহার উদ্দিন।
৪। প্রতিধ্বনি, সম্পাদকদ্বয়: ধনঞ্জয় সরকার ও পঙ্কজ পাল।

লেখক:
পংকজ পাল প্রিনয়
সহকারী শিক্ষক ও মাস্টার ট্রেইনার, রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, তরা, ঘিওর মানিকগঞ্জ এবং সম্পাদক পলিমাটিডটকম।

মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-এর বাকি পর্বগুলো পড়ুন:


কপিরাইট স্বত্ব ও ব্যবহারের শর্তাবলী:
© ২০২৬ [দৈনিক নতুন দেশ ২৪]। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই প্রতিবেদনটির সম্পূর্ণ বা আংশিক কোনো অংশ প্রকাশকের লিখিত অনুমতি বা মূল লিংকের ক্রেডিট ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক/ইউটিউব) বা প্রিন্ট মিডিয়ায় হুবহু কপি-পেস্ট বা পুনঃপ্রকাশ করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

পিযুষ পাল

জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক ঢাকার ডাক

স্টাফ রিপোর্টার,নতুন দেশ ২৪

ফেসবুক লিংক-

https://www.facebook.com/share/p/19FuSB4e6Z


Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

তীব্র ভাঙনে দিশেহারা চরাঞ্চলের মানুষ-শেষ সম্বল ভিটামাটি হারিয়ে দিশেহারা শতাধিক পরিবার।

তেরশ্রী জনপদের উৎপত্তি ও জমিদারি প্রতিষ্ঠা

মানিকগঞ্জের ইতিহাস: শিক্ষা-ঐতিহ্যে তেরশ্রী জমিদার বাড়ি এবং তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশনের জন্মকথা [মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ]

Update Time : ০৪:০৩:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

​মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার উত্তর প্রান্তে কালিগঙ্গা নদীর কাটালখালি খালের পাশে ছায়াঘেরা ঐশ্বর্যমণ্ডিত গ্রাম তেরশ্রী। তেরশ্রীর শ্রীবৃদ্ধি করেছিল যে বাড়ি, যাকে ঘিরেই অনেক গল্প-কাহিনী আর কথামালা তা হলো ‘তেরশ্রী জমিদার বাড়ি’। ‘তেরশ্রী এস্টেট’ নামে এ জমিদারির পতন।

ঘিওর উপজেলা সদর থেকে দুই-আড়াই কি.মি. উত্তরে তেরশ্রী জনপদ। এখানে জমিদার বাড়ির ভগ্নাশেষের সাথে মিশে আছে কিছু স্মৃতি আর আছে প্রীতময় ঐতিহ্য ও গৌরবাণিত অতীত।
​কয়েক শতাব্দীর স্মৃতির ধারক এ বাড়িটি। এ বাড়ির এক দূরদর্শী পুরুষ ১৯৪৭ এর দেশবিভাগ উত্তরকালে কলকাতায় আশ্রয় নেন। এখানে আছেন তেরশ্রী জমিদারের বর্তমান উত্তরসূরি সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী।

​জমিদার শব্দ শুনলেই, আমাদের অত্যাচারী কোন চরিত্র কল্পনায় ভেসে উঠে। তবে তেরশ্রী জমিদারগণ বংশপরম্পরায় এমনটি ছিলেন না। তাদের জনহিতকর কর্মযজ্ঞ দেখলেই সহজে অনুমান করা যায়। এই জমিদার বাড়ির জমিদারগণ ছিলেন অত্যন্ত সৌখিন ও রুচিশীল মানুষ। এঁরা জমিদারি ও প্রজাহিতৈষী কাজ করেই সময় কাটাতেন।

​জমিদার বাড়ির বিভিন্ন ভবন আর মন্দিরের নির্মাণশৈলী ছিল উন্নত রুচির পরিচায়ক। তেরশ্রী জমিদার বাড়ির স্থাপত্যকলার নিদর্শন এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্তমানে আর পর্যালোচনার সুযোগ নেই। কালের বিবর্তনে এবং সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

​তেরশ্রী জমিদারির স্থাপনকর্তা রামরতন রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন নবাব মীর কাসিমের দেওয়ান। ১৭৬৩ সালে মুঙ্গের যুদ্ধে মীর কাসিমের পরাজয়ের পর সবকিছু যখন এলোমেলো হয়ে যায়, তখন রামরতন রায়চৌধুরী জীবনের প্রয়োজনে চাপাইনবাবগঞ্জে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। শত্রুপক্ষ পিছু নেয়ায় জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৌলতপুর থানার ধামস্বর গ্রামে বসতি গড়েন। এখানে বেশ কিছুদিন বসবাস করার পর, রামরতনের পুত্র নর নারায়ণ রায়চৌধুরী ঘিওরের মাইলাগী গ্রামে অবস্থান নেন।

কালের পরিক্রমায় রামরতন বাবু প্রাগুক্ত জমিদার বাড়িতে দৃষ্টিবন্ধন এক মন্দির স্থাপন করেন। রামরতনের আত্মজ হরনারায়ণ রায়চৌধুরীর হাতে গৌরব-সৌরভের এই জমিদার বাড়ির পূর্ণাবয়ব স্থাপিত হয়।

হরনারায়ণ রায়চৌধুরী ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। নানান প্রতিবন্ধকতা ও বৈরিতায়ও তিনি সংগ্রামী জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ভাবলেন, ইংরেজদের সঙ্গে শুধু শত্রুতা করে লাভ হবে না। বিচক্ষণ রায়চৌধুরী মহোদয় এক্ষেত্রে মহামতি গৌতম বুদ্ধকে অনুসরণ করেন। তিনি বন্ধুত্ব দিয়ে ইংরেজদের সকল শত্রুতাকে জয়াজে সচেষ্ট হন। এভাবে স্বীয় বুদ্ধিবলে ইংরেজদের সাথে সৌহার্দ স্থাপন করে তেরশ্রী এস্টেটের জমিদারি প্রাপ্ত হন।

​জমিদারি প্রাপ্তির পর এ পরিবার রায়চৌধুরী উপাধি ব্যবহার শুরু করেন। যদিও এঁরা বংশগতভাবে ছিলেন বাগচী। বংশগৌরব ও আভিজাত্যবাদ এঁদেরকে কখনো আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। রেওয়াজ অনুযায়ী এ পরিবারের সদস্যগণ বাড়িতেই বিদ্যাশিক্ষা ও সংগীত-সংস্কৃতির চর্চা করতেন। তবে পরবর্তীতে এ রীতি আর বজায় থাকেনি। উত্তর-প্রজন্ম স্কুল-কলেজে বিদ্যা গ্রহণে ব্রতী হন।

​হরনারায়ণ রায়চৌধুরী ও কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী তেরশ্রী এস্টেটের বাইরেও শ্রীহট্টের (সিলেটের) বিজোড়া পরগণায় ও পাঁচানী এস্টেটে জমিদারির প্রসার ঘটান।
​জমিদারদের বংশ তালিকা :
​রামরতন রায়চৌধুরী
​নরনারায়ণ রায়চৌধুরী
​হরনারায়ণ রায়চৌধুরী
​কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী + জ্যোতির্ময়ী দেবী
= ​জ্যোতিপ্রসাদ রায়চৌধুরী
​সিদ্ধেশ্বরী + গায়ত্রী দেবী চৌধুরাণী
​= অঞ্জলি রায়চৌধুরী
​সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী
​বীণা রায়চৌধুরী
​এদের বংশধরদের কেউ কেউ পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার আলীপুরে রয়েছেন।

​তেরশ্রী জমিদারগণ জনবিচ্ছিন্ন শাসক ছিলেন না। তবে জমিদারি টিকিয়ে রাখতে ইংরেজ সরকার প্রবর্তিত অনেক আইনই তাঁদেরকে পালন করতে হতো। এক্ষেত্রে এঁরা ছিলেন কৌশলী এবং জনহিতার্থী। তৎকালে দুর্গোৎসব ছিল এ জমিদারির অনুভূতি ও আড়ম্বরের প্রতীক। আনন্দ-উৎসব আর আপ্যায়নে এ উৎসব রাজ্য জুড়ে সাড়া ফেলত। প্রজা সাধারণ পূজার্চনার সকল পর্বে ভক্তি-গীতিক ও সানন্দ চিত্তে অংশ নিতেন। সর্বজনীনতাই ছিল এ উৎসবের মূল প্রেক্ষাপট। আরেক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ছিল দোল ও হোলি।
তেরশ্রী জমিদারির আভিজাত্যের আরেক নিদর্শন সুউচ্চ নহবত খানা। বিভিন্ন উৎসব পার্বণে সানাইসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর মূর্ছনায় বিমোহিত হতো সবার হৃদয়। নহবত খানাটি ছিল এ অঞ্চলের এক সুরেলা ভোরের পাখি।

তেরশ্রীর জমিদারদের নানা কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট মহাত্মাগণ :
জমিদার হরনারায়ণ রায়চৌধুরী: জমিদার ভবন, কাচারী বাড়ি ও নাটমন্দির স্থাপন করেন। তিনি প্রজা বৎসল, শান্তিপ্রিয় ও আড়ম্বরহীন জীবনযাপনের অধিকারী এক যোগী পুরুষ।

জমিদার কালী নারায়ণ রায়চৌধুরী: ইনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীলচাষ নীতির বিরুদ্ধেচারণ করেন। এক্ষেত্রে তাঁর সাহসী ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি শ্রীঘরনগর হাটের (যা পরবর্তীতে ঘিওরে স্থানান্তরিত) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিভিন্ন সুপেয় জলাধার-কূপ-ইন্দ্রা ও মন্দির নির্মাণ করেন। নানা দুর্ভিক্ষে এ জমিদার প্রজা কল্যাণে সহযোগিতার হাত বাড়ান যা আজও অনুকরণীয়-অনুসরণীয়।

​জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী: গৃহ শিক্ষকগণের যত্ন ও সহায়তায় বাবু সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। ইনি ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক দার্শনিক। শিক্ষা দর্শনকে তিনি জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। বিচিত্র পুস্তক সংগ্রহ-সংরক্ষণ ও পাঠে এই রত্নপুরুষ ছিলেন অগ্রণী। তাঁর প্রচেষ্টায় নিজ গৃহে এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল বিজ্ঞান, সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অসাধারণ ঝোঁক ছিল। এসব ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভাও অনন্য। তাঁর প্রতিভা বহুমুখী ও সর্বগামী। ১৯২২ সালে এই মহামানব পিতার পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থে ‘তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। স্মর্তব্য, এ কর্মযজ্ঞে পেছনের উৎসাহী কারিগর তাঁর প্রথম স্ত্রী জ্যোতির্ময়ী দেবী।

​তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশনের জন্মকথা
জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী মাত্র পনেরো বছর বয়সে পিতৃহারা হন। ফলে আকস্মিক বাস্তবতায় জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পরে। তৎকালীন সামাজিক রীতি অনুসারে অল্প বয়সেই তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রাম গোপালপুরের ধনশালী রায়বাহাদুর জমিদার পরিবারের একমাত্র কন্যা জ্যোতির্ময়ী দেবীকে মাত্র ষোল বছর বয়সে বিয়ে করেন। জ্যোতির্ময়ী দেবী শ্বশুর বাড়িতে এসে দেখেন এই এস্টেটে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল বা সভা সমাজের অনুগ্রহ প্রতিষ্ঠানের কোনটিই নেই। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শ্বশুর বাড়ি ত্যাগ করে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্বামীর কাছে বায়না ধরেন “আপনি প্রজা কল্যাণের প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন করলেই আমি আপনার সঙ্গে শ্বশুরালয়ে ফিরব।” জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ স্ত্রীর কথা রাখতে প্রায় চল্লিশ বিঘা ভূসম্পত্তি দানসহ প্রতিষ্ঠা করেন ‘তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন’।

দুর্ভাগ্য! জ্যোতির্ময়ী দেবী তাঁর ইচ্ছে পূরণের এ মহাকীর্তি দেখে যেতে পারেননি। মাত্র দুই বৎসরের বিবাহিত জীবনে প্রথম সন্তান জন্মদানের মাত্র চার ঘণ্টা পর তিনি পরলোক গমন করেন।

বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিও ছিলেন ৮টি ভাষায় সুপণ্ডিত। গীতাকোরআন, বাইবেল ও ত্রিপিটক এই চারটি ধর্মগ্রন্থে ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। তিনি ছিলেন আজন্ম একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। নিজে ওয়্যারলেস তৈরি করে তিনি বৃটেনের রানীর সাথে কথা বলতেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন স্থপতি। কবিগুরু শান্ত নিকেতন ট্রাস্টি বডির একজন সদস্য হিসেবে সেখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেন। তেরশ্রী জনপদে বহু মন্দিরের পাশাপাশি তিনি অনেক মসজিদকেও ভূসম্পত্তি দান করেন।

সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী সিলেটের ছাতিয়ান হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। মানিকগঞ্জ মহকুমার প্রথম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘তেরশ্রী কলেজ’ (১৯৪২) প্রতিষ্ঠায়ও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসাকল, ডাকঘর, তেরশ্রী বাজারসহ অসংখ্য জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ ১৯৭১ সালে মুক্তিকামী বাঙালির এক সফল সংগঠক। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হতে আগত উৎবাতদের পরম যত্নে আশ্রয় দেন নিজ বাড়িতে। ফলে জমিদার ও তাঁর বাড়িটি পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের টার্গেট হয়।

এছাড়া এই প্রতিভাবান ব্যক্তি ঢাকা যাদুঘর ও বাংলা একাডেমিতে বহু দুর্লভাপুস্তক, অর্থ ও রাজকীয় সাজ সরঞ্জাম দান করেন। সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনচেতা মানুষ। জমিদার হয়েও স্বাধীন ভারত ভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আত্মনিবেদন করেন। গোলামীর শৃঙ্খল ছিন্ন করার লক্ষ্যে গ্রহণ করেন স্বাধীনতার বীজমন্ত্র, যোগ দিয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজ। এ বাহিনীর একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সেই সময়ই মৃত্যুবধি তিনি স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশীয় পণ্যে জীবন ধারণে অভ্যস্ত হন।
​বিদগ্ধ পাঠক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল সবার কাছে। কলকাতার মানিকগঞ্জ সুহৃদ সম্মলনী প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল।

১৯৭১ সালে ২২ নভেম্বর পাকবাহিনী নির্মমভাবে মহামতি জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরীকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জীবন্ত অগ্নিগ্ধ করে হত্যা করার দ্বিতীয় নজির আছে বলে আমাদের জানা নেই। সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়চৌধুরী দ্বিতীয় দার পরিগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জের মিতরা গ্রামের বিখ্যাত ভট্টাচার্য পরিবারের কন্যা গায়ত্রী দেবীকে। তাঁদের ঘরে এক পুত্র এবং দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম কন্যা অঞ্জলি রায়চৌধুরী কলকাতার এক স্কুলের শিক্ষয়িত্রী। পুত্র সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী তেরশ্রী জমিদারেশনের শিক্ষকতা পেশা শেষ করে অবসর গ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ কন্যা বীণা রায়ও শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এক অনিবর্ষণীয় দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সোমেশ্বর বাবুর সহধর্মিণী শ্রীমতী শুকলা গোস্বামীও একই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন।

শিক্ষা-শিক্ষকতা-জ্ঞান বিতরণ ও কৃষ্টি-কালচারে এক অনন্য পরিবার ‘তেরশ্রী জমিদার বাড়ি’। কালের গতি- প্রকৃতির পরিবর্তন-বিবর্তনে এ পরিবারের অবদান এ অঞ্চলের মানুষকে সৎকর্মের উদ্দীপ্ত করে চলেছে। সামগ্রিক বিচারে, শিক্ষা-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এ অঞ্চলবাসী সবাই তাঁদের নিকটে ঋণী-কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ।

​তথ্যসূত্র :
১। সোমেশ্বর প্রসাদ রায়চৌধুরী, জমিদারপুত্র, তেরশ্রী এস্টেট।
২। বিজয় দিবসের সুধী সংবর্ধনা ‘স্মরণিকা’, ঘিওর উপজেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ১৯৭৫।
৩। মানিকগঞ্জের শত মানিক, সম্পাদক: মোঃ আজাহার উদ্দিন।
৪। প্রতিধ্বনি, সম্পাদকদ্বয়: ধনঞ্জয় সরকার ও পঙ্কজ পাল।

লেখক:
পংকজ পাল প্রিনয়
সহকারী শিক্ষক ও মাস্টার ট্রেইনার, রমজান আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, তরা, ঘিওর মানিকগঞ্জ এবং সম্পাদক পলিমাটিডটকম।

মানিকগঞ্জের গুণীজন সিরিজ-এর বাকি পর্বগুলো পড়ুন:


কপিরাইট স্বত্ব ও ব্যবহারের শর্তাবলী:
© ২০২৬ [দৈনিক নতুন দেশ ২৪]। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই প্রতিবেদনটির সম্পূর্ণ বা আংশিক কোনো অংশ প্রকাশকের লিখিত অনুমতি বা মূল লিংকের ক্রেডিট ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক/ইউটিউব) বা প্রিন্ট মিডিয়ায় হুবহু কপি-পেস্ট বা পুনঃপ্রকাশ করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

পিযুষ পাল

জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক ঢাকার ডাক

স্টাফ রিপোর্টার,নতুন দেশ ২৪

ফেসবুক লিংক-

https://www.facebook.com/share/p/19FuSB4e6Z